ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

পণ প্রথা ও আমাদের সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে লেখার আগে একটা ছোট্ট গল্প বলে শুরু করি।

“মেয়ে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে, একেবারে লক্ষী প্রতিমার মত!”, মেয়ে দেখতে এসে পাত্রপক্ষের মন্তব্য।

সেই শুনে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা ও মাতার মুখ ফুটে যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস আর নিশ্চিন্তের হাসি বেরিয়ে এল ঠিক তখনই পাত্রের মা বলে ওঠে,”ছেলে আমার বড় ভাল, কলকাতার কাছে রাজারহাটের এক নামজাদা আই টি অফিসে কাজ করে,পুজোর পর অফ-শোর প্রজেক্টের জন্য স্টেটস এ যাবে, তাই বিয়ের কাজকর্মটা আমরা তার আগেই সেরে নিতে চাই, আপনাদের আপত্তি না থাকলে পুরোহিত ডেকে বিয়ের দিনক্ষণ তাহলে ঠিক করে ফেলি, কি বলেন ?”

টাকা পয়সা জোগাড় করা নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তিত হলেও, অগত্যা মেয়ের বাবা কোনোরকমে ঢোক গিলে হাসি হাসি মুখে বলে ওঠেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে, কোনো অসুবিধে নেই”।

তখন ছেলের মা বলেন, “দেখুন আমাদের কিন্তু কোনো দাবিদাওয়া নেই, আমরা ওইসব পণ টন চাইনা, শুধু ইয়ে মানে ওই গোটা পঞ্চাশেক আত্মীয়স্বজনের জন্য কিছু প্রণামী, আর তাছাড়া আপনারা আপনাদের মেয়ে অবশেষে বিবাহের দিন উপস্থিত হইল। নিতান্ত অতিরিক্ত সুদে একজন বাকি টাকাটা ধার দিতে স্বীকার করিয়াছিল, কিন্তু সময়কালে সে উপস্থিত হইল না। বিবাহসভায় একটা তুমুল গোলযোগ বাধিয়া গেল। রামসুন্দর আমাদের রায়বাহাদুরের হাতে-পায়ে ধরিয়া বলিলেন, ‘শুভকার্য সম্পন্ন হইয়া যাক, আমি নিশ্চয় টাকাটা শোধ করিয়া দিব।’ রায়বাহাদুর বলিলেন, ‘টাকা হাতে না পাইলে বর সভাস্থ করা যাইবে না।’আর জামাই কে যা ভালোবেসে দেবেন তা, কারণ খালি হাতে তো আর কোনো অভিভাবক তাদের মেয়ে কে বিদায় দেয়না, তাই না !”

পণ প্রথা
চিত্র সূত্রঃ Wikimedia Commons

উপরোক্ত গল্পটি আমার বানানো হলেও আমাদের পারিপার্শ্বিক সমাজের এই চিত্রটির সাথে সকলেই কম বেশি পরিচিত।

এখন এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রকৃতির নিয়ম মেনে বাকি সব কিছুর মতোই পণেরও কিঞ্চিৎ রূপান্তর ঘটেছে এবং তা বাঙালি সমাজে ‘প্রণামী’, হিন্দি ভাষী সমাজে ‘তিলক’, পাঞ্জাবি সমাজে ‘রোকা’, ইত্যাদি নানান বাহারি নামে তার ছদ্মবেশী একটি পরিচিতি বহন করে চলেছে।

এই দেনা পাওনার হিসেব আজ থেকে নয়, সমাজে বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটির জন্মলগ্ন থেকেই একে অপরের হাত ধরাধরি করে চলেছে। এই প্রসঙ্গে রবি ঠাকুরের “দেনা পাওনা” ছোটগল্পের একটি অংশ উল্লেখ না করে পারলাম না –

‘…অবশেষে বিবাহের দিন উপস্থিত হইল। নিতান্ত অতিরিক্ত সুদে একজন বাকি টাকাটা ধার দিতে স্বীকার করিয়াছিল, কিন্তু সময়কালে সে উপস্থিত হইল না। বিবাহসভায় একটা তুমুল গোলযোগ বাধিয়া গেল। রামসুন্দর আমাদের রায়বাহাদুরের হাতে-পায়ে ধরিয়া বলিলেন, ‘শুভকার্য সম্পন্ন হইয়া যাক, আমি নিশ্চয় টাকাটা শোধ করিয়া দিব।’ রায়বাহাদুর বলিলেন, ‘টাকা হাতে না পাইলে বর সভাস্থ করা যাইবে না।’

পণ প্রথা নামক এই সামাজিক ব্যাধি থেকে ভারতীয় সমাজকে মুক্ত করতে ভারতের নির্বাচিত আইন প্রণেতারা নানান গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন যেমন –

  • Dowry Prohibition Act, 1961
  • Section 498A in the IPC(1983)
  • Section 304B in the IPC(1986)
  • Section 113B in the Indian Evidence Act (1986)

এই নানাবিধ আইনের দ্বারা উক্ত সামাজিক ব্যাধি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও পুরোটা নির্মূল করা যায়নি আর তারই সাক্ষ্য বহন করছে নিম্নোক্ত National Crime Records Bureau-র Crime in India, 2016, রিপোর্ট –

পণ প্রথা
সুত্রঃ ক্রাইম ইন্ ইন্ডিয়া, ২০১৬
পণ প্রথা
সুত্রঃ ক্রাইম ইন্ ইন্ডিয়া, ২০১৬
পণ প্রথা
সুত্রঃ ক্রাইম ইন্ ইন্ডিয়া, ২০১৬

এই পণ প্রথার সাথে সমাজের আরও অন্যান্য ব্যাধিগুলিও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত যেমন কন্যাভ্রূণ হত্যা তারমধ্যে অন্যতম।


আরো পড়ুন – ধর্ষণ এখন সমাজের রোজনামচা !!


এই ব্যাধিকে সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল করতে হলে দরকার মেকি সামাজিক রীতিনীতির বিপক্ষে আওয়াজ তোলা, নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো, সচেতনতা বৃদ্ধি করা, সঠিক আইন প্রণয়ন, বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দ্রুতলয় কাজ করার ক্ষমতা এবং সবচেয়ে জরুরি যেটা, সেটা হল ‘দেনা পাওনা’ -র নিরূপমাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে “না” বলতে পারার সৎ সাহস।

অদূর ভবিষ্যতে আশাকরি কোনো লেখককে আর লিখতে হবেনা –

“এবারে বিশ হাজার টাকা পণ এবং হাতে হাতে আদায়।”


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন