ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

NRC খায় না মাথায় দেয় ? বেশ চলুন চায়ের দোকানের গরম পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে এঁড়ে তর্ক না করে আমরা বরং একেবারে গোড়া থেকে শুরু করি।

NRC – র মতো বিতর্কিত বিষয় লেখার আগে একটা কথা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই যে, এই লেখাটি আমি কারুর মন রাখতে লিখতে পারবোনা তাই যদি সরকারের বা বিরোধীপক্ষের সমালোচনা সহ্য করতে অসুবিধা বোধ করেন তাহলে আর এগিয়ে শরীরে হাইড্রো ক্লোরিক অ্যাসিড বাড়িয়ে বদ হজম সৃষ্টি করার চেয়ে বরং এখানেই থেমে যাওয়াটা শ্রেয়, কারণ অনেক সময়ই আবার জেলুসিল ঠিক মত কাজ দেয় না।


দেখুন যেকোনো জায়গার প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণে ডেমোগ্রাফি বদল হতে থাকলে সেই নির্দিষ্ট জায়গার ভাষা ও সংস্কৃতির উপর প্রথম আঘাতটা পড়ে ঠিক যেমনটা এই আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নিকোবারী আদিবাসীদের সাথে হয়েছে আর এতটাই প্রবলভাবে হয়েছে যে সেই জনজাতির নিজস্বতা টাই এখন হিন্দির দৌলতে প্রায় অবলুপ্তির পথে। তাই সেইদিক দিয়ে দেখতে গেলে কিছু ক্ষেত্রে অসমের আদি জনজাতিদের এই উদ্বেগ যথেষ্টই বাস্তবিক। কিন্তু এই আশঙ্কাটা এলো কিভাবে ? আসুন দেখি –

সব ইতিহাসের একটা পূর্ব ইতিহাস থাকে এখানেও তার অন্যথা নেই। প্রথম অ্যাংলো – বর্মা যুদ্ধের সমাপ্তির পর ১৮২৬ এর ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ও বর্মার মধ্যে ইয়ান্ডাবু সন্ধি স্বাক্ষরের মধ্যে দিয়েই এই অনুপ্রবেশের সূচনা হয়। এই ইয়ান্ডাবু সন্ধির শর্ত সমূহ নিম্নে দেওয়া হল –

  • অসম, মণিপুর, আরাকান ও টেনাসরিম সহ শালউইন নদীর দক্ষিণ উপত্যকা ব্রিটিশদের হাতে ন্যাস্ত করা।
  • কাছাড় ও জৈন্তিয়া অঞ্চলে হস্তক্ষেপ না করা।
  • যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ লক্ষ ব্রিটিশ পাউন্ড চারটি কিস্তিতে ব্রিটিশদের পরিশোধ করা।
  • আভা ও কলকাতার মাঝে স্থায়ী ব্রিটিশ প্রতিনিধি নিয়োগ করা।
  • ব্রিটিশদের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করা।
NRC খায় না মাথায় দেয় ?
চিত্র উৎস – Wikimedia Commons

এই চুক্তিই বিভিন্ন কোন থেকে অসমে অনুপ্রবেশের দরজা হাট করে খুলে দেয় আর নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য যেমন তামিলদের শ্রীলংকায় কফি চাষ করতে তুলে নিয়ে গিয়ে সেখানকার ডেমোগ্রাফির তেরোটা বাজিয়েছিল যার রেশ আজও শ্রীলংকার রাজনীতিতে তামিল ও সিংহলদের ঝগড়ার মধ্যেই বিরাজমান ঠিক তেমনই ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন কোন থেকে অসমে শ্রমিক হিসাবে তুলে নিয়ে গিয়ে এই অনুপ্রবেশের পথ কে প্রশস্ত করেছিল। আমি বলছি শুনুন এই ব্রিটিশ আর মার্কিনিরা সব জায়গায় গিয়ে খিচুড়ি পাকানোর ফল আজ সারা বিশ্ব কে বহন করতে হচ্ছে। অসমে এই মাইগ্রেশন পাঁচটা স্তরে হয় –

  • চা বাগানের শ্রমিক হিসাবে
  • পূর্ব বঙ্গ থেকে কৃষকদের এই ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ফসল ফলিয়ে দু মুঠো খেয়ে পরে বাঁচার আশায়
  • নেপাল থেকে কিছু মানুষ আসে গবাদি পশু রক্ষনাবেক্ষণের জন্য
  • ব্যবসায়ী এবং কারিগর হিসাবে
  • অন্যান্যরা যারা ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত যেমন বেতনভুক্ত কর্মচারী, খনিজের শ্রমিক, প্রশাসক, ইত্যাদি।

ঠিক এই সময় আসামে চা-এর ফলনের আবিষ্কারের সাথে সাথে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সাহেবের ওখানে চা শিল্প গড়ে তোলার সুপ্ত বাসনা জাগে, আর ইয়ান্ডাবু সন্ধির চুক্তি সেই পথটাকে খানিকটা মসৃণ করে। চীন থেকে কলকাতায় চর্ম ও ছুতোর ব্যবসায়ীদেরকেও ওই সময় দলে দলে দার্জিলিং ও অসমে পাঠানো হয়েছিল। এর সাথে সাথে ব্রিটিশরা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করতে অসমে, পূর্ব বঙ্গ সহ ভারতের বিহার, ইউনাইটেড প্রভিন্স(বর্তমান উত্তর প্রদেশ), উড়িষ্যা, ছোটানাগপুর, মাদ্রাস সহ বিভিন্ন কোন থেকে চা বাগানে কাজ করার শ্রমিকদের নিয়ে এসেছিল। অসমের এই মাইগ্রেশনের ইতিহাসকে বহুযুগ ধরে সযত্নে বহন করে চলেছে বাংলা ও অসমের লোকসংস্কৃতি আর তাই তো ঝুমুর লোকসংগীতের মাধ্যমে কখনো বেরিয়ে আসে –

মনে করি আসাম যাবো আসামে তে নোকরি লিবো

মনে করি আসাম যাবো আসামে তে নোকরি লিবো

বাবু বলে কাম কাম সাহেব বলে ধরি আন

সরদার বলে লিবো পিঠের চাম

হে যদুরাম ফাকি দিয়া চলাইলি আসাম!!

বা কখনো ধামসা মাদলের বোলের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছে –

চল মিনি আসাম যাবো

দেসে বড় দুখ রে

আসাম দেসে রে মিনি

চা বাগান ভরিয়া

এক পয়সার পুটিমাছ

গায়াগুনার ত্যাল গো

মিনির বাপে মাঙে যদি

আরোই দিব ঝোল গো।

কুড় মারা যেমন তেমন,

পাতি তোলা কাম গো

কুড় মারা যেমন তেমন

পাতি তোলা কাম গো

হায় যদুরাম ফাঁকি দিয়া পঠাইলি আসাম।

১৮৭৪ সাল,বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভেঙে ব্রিটিশ সরকার জন্ম দেয় আসামের,তৎকালীন নাম ছিল নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার। পরবর্তীতে ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গের সময়ে পূর্ব বঙ্গের সাথে আসামকে যুক্ত করে দিয়ে ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড অসম বলে একটি আলাদা প্রভিন্স গঠন করা হয়, যার সাথে বরাক উপত্যকা সহ বাঙালি অধ্যুষিত একটা বড় এলাকা আসামের সীমানার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ জন্মলগ্ন থেকেই বাঙালি অঞ্চলের ভূমিপুত্র।

NRC খায় না মাথায় দেয় ?
চিত্র উৎস – Wikimedia Commons

এরপর নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে আসে ১৯৪৭ এর দেশ থুড়ি পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগ, যার রক্তক্ষয়ী স্মৃতির ভার আজও বহন করে চলেছে এই উপমহাদেশের বৃহৎ সংখ্যক মানুষ। পূর্ব পাকিস্তান থেকে অধিকাংশ হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গে, ত্রিপুরা, অসম, মেঘালয়, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ইত্যাদি রাজ্যে আশ্রয় নেন। এই শরণার্থীদের একটা তথ্য ভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখা যাক –

NRC খায় না মাথায় দেয় ?
তথ্য সূত্রঃ উইকিপেডিয়া

উত্তর পূর্বের বাঙালিদের প্রতি অহমীয়া জাতির বিদ্বেষ মূলক একটি সংগঠিত প্রচারাভিযানের সূচনা ঘটে, যা অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে এবং ১৯৮০-এর দশকে মেঘালয় ও ত্রিপুরাতে “বঙ্গাল খেদা” বা “বাঙালি খেদা” নামক আন্দোলন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার বাঙালি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে বিতাড়িত হয় এবং পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গে স্থানান্তরিত হয়। এক অনুমান অনুযায়ী এই সময় প্রায় ৫,০০,০০০ বাঙালি অসম থেকে বাস্তুচ্যুত হয়। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেরণায় অসমেও ১৯৬১ র ১৯ এ মে বাংলা ভাষা কে রাজ্যের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা করার দাবীতে ১১ জন ভাষা প্রেমিককে শহীদ হতে হয়।

যেকোনো দেশ থেকে অন্য কোনো দেশে অনুপ্রবেশের মূল কারণ হল আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতির সুপ্ত বাসনা আর এই উপমহাদেশে ভারত-বাংলাদেশের মতো সুদীর্ঘ ও আলগা সীমান্ত সেই পথটাকে কিছুটা হলেও মসৃণ করে দেয়। সাতচল্লিশে যখন ভারতবর্ষ তার ক্ষত বিক্ষত দেহ নিয়ে আই সি ইউ তে তখনই অস্ত্রপ্রচার করার জন্য এমন এক ব্রিটিশ আইনজ্ঞ কে ভারতে আমদানী করে আনা হল যাঁর ভারত সমন্ধে জ্ঞান প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সেই র‌্যাডক্লিফ সাহেব এমন নিপুণতার সাথে স্ক্যাল্পেল চালিয়ে ভারতের ডিসেকশন করলেন যে দেখা গেল কিছু কিছু জায়গায় কারুর রান্না ঘর পড়েছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তো শোয়ার ঘর পড়েছে ভারতে, ফলে এক বিস্তর জগাখিচুড়ির সৃষ্টি হয় যেই ফাঁক গলে আজও উভয় দিক থেকেই চোরাচালান, হিউম্যান ট্রাফিকিং থেকে শুরু করে অবৈধ অনুপ্রবেশ সবই হয়ে চলেছে।


আরো পড়ুন – ভারতীয় সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা


সত্তরের দশকের একেবারে গোড়ার দিকে যখন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক হারে শুরু হল পাকিস্তানী মিলিটারি ও রাজাকারের নির্যাতন ও হত্যালীলার দানবীয় উৎসব। তখন বিপুল সংখ্যক হিন্দু শরণার্থীরা প্রাণের দায় নিজের ভীটে মাটির মায়া ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয়ের সন্ধানে চলে আসে। ফলত আগুনে যে একফোঁটা ঘি এর যে অভাব ছিল সেটাও এবারচুঁয়ে চুঁয়ে পড়তে লাগল।

এই ধারা বহুকাল ধরে অব্যাহত থাকে, ফলে অসম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয় এর জনসংখ্যার গ্রাফ ক্রমশই উত্তরমুখী হতে থাকে।

তথ্য সূত্রঃ Researchgate

এই সময় অহমীয়রা নিজেদের অস্তিত্ব সংকটের অশনি সংকেত পেয়ে প্রতিবাদ, বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ধীরে ধীরে আশির দশকে অসমের ছাত্র সংগঠন আসু’র (অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) নেতৃত্বে এই আন্দোলন রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ এই পাঁচ বছর ছিল অসমের রক্তক্ষয়ের ইতিহাস। অসমজুড়ে এই তীব্র আন্দোলনের জেরে শেষে পদক্ষেপ করতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় সরকার। ১৯৮৩ সালে ইন্দিরা গাঁধীর সরকার ইল্লিগাল মাইগ্রেন্টস (ডিটারমাইন্ড বাই ট্রাইবুনাল) বা আইএমডিটি অ্যাক্ট তৈরি করে। অসমের এই টালমাটাল সময়ে সংখ্যালঘুদের হেনস্থার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য শুধু অসমের ক্ষেত্রেই এই আইনটি তৈরি করা হল। বাকি রাজ্যে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬’, এর ব্যবহারই লাঘু ছিল। পরবর্তীকালে ১৯৮৫ সালের, ১৫ই আগস্ট, রাজীব গাঁধী নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এবং আসু’র মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয় যা “অসম অ্যাকর্ড” নামে পরিচিত, যার মধ্য দিয়ে ‘বিদেশি’ চিহ্নিত করে বিতরণের প্রক্রিয়ায় সিলমোহর পরে। এই চুক্তির ক্লজ ৫ এ বলা হয় –

Foreigners who came to Assam after 1.1.1966 (inclusive) and upto 24th March, 1971 shall be detected in accordance with the provisions of the Foreigners Act, 1946 and the Foreigners (Tribunals) Order 1964.

এই সূত্র ধরেই অসমে NRC নামক বিদেশী চিহ্নিতকরণের দাবী ওঠে যা বাস্তবায়িত করার জন্য ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই ছাকনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত বছর, মানে ২০১৮’র ৩১ শে জুলাই, NRC খায় না মাথায় দেয় ? সেই বিষয় কিছু বুঝে ওঠার আগেই চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হয় যাতে প্রায় ৪০ লক্ষ বিদেশী শনাক্ত হয়েছে বলে দাবী করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি কিছুদিন আগে ৩১ শে অগাষ্ট, ২০১৯, যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়, তাতে দেখা যায় প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষ এই তালিকার বাইরে। যদিও এই তালিকা নিয়ে কেউই সন্তুষ্ট নয়, বিরোধীপক্ষ ও নয়, বিজেপিও নয়। কারও স্ত্রী, কারও মা, কারও সন্তান এখন ‘বিদেশি’। এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর এমনই বিচিত্র অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে অসমে। হাজার হাজার বৈধ ভারতীয় নাগরিক, সিআরপিএফ এবং অন্য জওয়ান এমনকী, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদের পরিবারের সদস্যদের নামও বাদ গিয়েছে।

এই তালিকায় দেখা যায় –

  • সত্তরোর্ধ্ব উকিল হয়ে যান বিদেশী।
  • কার্গিল যুদ্ধে লড়াই করা ভারতীয় সৈনিক একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন পেনের খোঁচায় হয়ে যান বিদেশী।
  • এমনকি বিজেপি কর্মীও নিজের নাম খুঁজে পাননি।
  • কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ হলেই তাকে বাংলাদেশী ঠাহর করে তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।

NRC-র মতো এই এত বড় একটা জটিল প্রক্রিয়াকরণের সময় স্বভাবতই কিছু ভুলভ্রান্তি হবে আর এতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই, কিন্তু সেই ভুলভ্রান্তি যখন মাত্রাতিরিক্ত হয় তখন অবিশ্বাসের উপর ভর করে তৈরী হয় একটা ভয়ের বাতাবরণ। আর এই ভয়ে কে কাজে লাগিয়ে দুই পক্ষই শুরু করে ফিয়ার সাইকোসিস নিয়ে খেলতে।

মানুষ প্রধানত দু’টি তাড়নায় পরিচালিত হয়: ভালবাসা আর ভয়। যারা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বা ইতিহাসের ছাত্রছাত্রী তারা আশাকরি ম্যাকিয়াভেলির কথা শুনেছেন। ম্যাকিয়াভেলি তাঁর “দ্য প্রিন্স” গ্রন্থে বলেছেন,

“ভালবাসার কারণ না হয়ে ভয়ের কারণ হওয়াই অধিক নিরাপদ কারণ ভালবাসার সাথে দায়বদ্ধতার সম্পর্ক আছে; মানুষের সংকীর্ণতার কারণে তা সুযোগ পেলেই লঙ্ঘিত হতে পারে। কিন্তু আপনাকে ভয় পেলে শাস্তির ভয়ে তারা তা লঙ্ঘন করতে পারে না।”

আপনারা যদি বর্তমান পরিস্থিতির উপর নজর রেখে থাকেন তাহলে ম্যাকিয়াভেলির এই বক্তব্যটি বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার পক্ষ প্রতিনিয়ত এই অনুপ্রবেশের ভয় দেখিয়ে চলেছেন যাতে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ে সরকারকে মেসিয়াহা রূপে দেখে আর বিরোধীপক্ষ মানে মমতা বন্দোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গে এই ভয়ে কেই কাজে লাগিয়ে তাঁর হারিয়ে ফেলা সমর্থন আবার ফেরানোতে স্বচেষ্ট হয়েছেন।

সেইকারণেই ম্যাকিয়াভেলি “দ্য প্রিন্স” গ্রন্থে বলেছেন, শাসনক্ষমতার বৈধতা কোন নৈতিকতার মাপকাঠিতে আবদ্ধ নয়; কর্তৃত্ব আর ক্ষমতাই এখানে মূল বিষয়। যার ক্ষমতা আছে সে-ই শাসন করবে, নৈতিকতা কাউকে ক্ষমতায় বসায় না। ক্ষমতা অর্জন আর ক্ষমতা রক্ষা করাই রাজনীতির মূল নীতি।

এইবার এই ১৯ লক্ষ সংখ্যা নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে প্রচুর মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু এইখানে মূল প্রশ্নটা হল, এই ১৯ লক্ষ অবাঞ্ছিত দের নিয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে ?

দেখুন প্রথমে এই ১৯ লক্ষ মানুষই ১২০ দিনের মধ্যে ফরেইনার্স ট্রাইব্যুনালে উপযুক্ত প্রমাণসহ আবেদন করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ভারতে প্রশাসনিক কাজকর্ম কত দ্রুতবেগে হয় তা আশাকরি সকলেরই জানা !

এইখানেও যারা নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবেন না তাদের আপাতত ঠিকানা ডিটেনশন ক্যাম্পে হলেও তারা হাই কোর্ট এবং সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করতে পারবেন। সেক্ষেত্রেও ভারতীয় আইন ব্যবস্থার “তারিখ পে তারিখ” এর কথা সর্বজনবিদিত !

তাই এরপরেও যারা নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হবেন তাদের কী হবে ?

১. ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্ এর কথা অনুযায়ী সকলকেই বিতাড়িত করা হবে। যদি তাই হয় তাহলে সম্প্রতি বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশে গিয়ে বলে এলেন কেন যে, এন আর সি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় আর এই নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের চিন্তার কোনো কারণ নেই !

২. বাংলাদেশের উপর কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে কিছু সংখ্যক মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। এরফলে কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হতে পারে সেটা বলাই বাহুল্য। আর আমার মনে হয় না উত্তর পশ্চিম এবং উত্তর সীমান্তের মতো ভারত তার পূর্ব সীমান্তেও একই সমস্যা তৈরী করবে বলে।

৩. ১৯ লক্ষের মধ্যে যেহেতু ১২ লক্ষই হিন্দু তাই সিটিজেনশিপ অ্যামেণ্ডমেন্ট বিল, ২০১৬ পাশ করিয়ে হিন্দুদের রিফিউজি হিসাবে রেখে দিয়ে ৬ বছর পর আবেদনের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে আর বাকি ৭ লক্ষ অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে বিতাড়িত করা হবে। কিন্তু সিটিজেনশিপ অ্যামেণ্ডমেন্ট বিল টাই তো ভারতীয় সংবিধানের ১৫ নং অনুচ্ছেদে (যা জাতি,ধর্ম,বর্ণ,গোত্র,লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল ভারতীয় নাগরিককে সমান অধিকার প্রদান করেছে।) এবং অসম অ্যাকর্ডের ক্লজ ৫ এর পরিপন্থী।

৪. সকলকে ধরে অসমে সরকারী খরচে গজিয়ে ওঠা অমানবিক ডিটেনশন ক্যাম্পে স্থানান্তরিত করা।

৫. তাদের কাছ থেকে সমস্ত নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে শুধুমাত্র জীবিকা নির্বাহের জন্য ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখা এবং নির্দিষ্ট সময় পর আবেদনের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদান করা।


এইবার আমার কিছু প্রশ্ন –

  • অনুপ্রবেশ ঠেকাবার জন্য কাঁটাতারের বেড়া, কেন্দ্রীয় সরকারের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের চৌকি ছাড়াও দু’তরফের গোয়েন্দা বাহিনীর নজরদারি চলে। এতকিছু থাকা সত্বেও কী করে অবৈধ অনুপ্রবেশ হয় ?
  • অসমে প্রতি বছরভয়ংকর বন্যা হয়, সেটা হয়ত আপনারা জানেন। এবার আমার প্রশ্ন হল এই অঞ্চলের স্বল্প শিক্ষিত কোনো কৃষক যদি তার সমস্ত নথিপত্র এই বন্যায় হারিয়ে ফেলেন তাহলে তাঁর কী হবে ? তিনি কীভাবেই বা তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণ করবেন ?
  • একাত্তর থেকে ২০১৯ প্রায় চার দশক, এই চার দশকে দুটো প্রজন্ম তৈরী হয়ে যায়। তাই আমার খুব সহজ সরল প্রশ্ন এতদিন ধরে যিনি রিক্সা চালিয়ে এই দেশের অর্থনীতিতে স্বল্প মাত্রায় হলেও যে অবদান রাখছিলেন তিনিই তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পেরে ডিটেনশন ক্যাম্পে গিয়ে থাকবেন, ভালো কথা, কিন্তু আমার প্রশ্ন এই ডিটেনশন ক্যাম্পের খরচ তাহলে কারা বহন করবেন ?

তবে অনুপ্রবেশ হয়না বা হয়নি এই বলে লোক হাসানোর কোনো স্পৃহা আমার নেই। অনুপ্রবেশ অতীতেও হয়েছে আর বর্তমানেও হয়ে চলেছে আর ভবিষ্যতেও হবে, কিন্তু সেই অঙ্কের হিসাবটা কখনই অমিত বাবু বা দিলীপ বাবুর ওই কাল্পনিক ১ কোটি বা ২ কোটির নয়। অন্তত ২০১১ সালের আদমশুমারি সেই কথাই বলছে।

এই প্রসঙ্গে IIM AHMEDABAD এর অধ্যাপক চিন্ময় তুনবে  লিখছেন

Bangladeshis and Nepalese are most likely looking at better prospects in Europe and the Persian Gulf as new migrant trails emerge, leaving a ripple effect on their eventual numbers in India.

অনেক কথাই বললাম, আশাকরি বোঝাতে পারলাম, NRC খায় না মাথায় দেয় ? আমার এই লেখা কারুর ভালো লাগতে পারে আবার কারুর খারাপ, আমি দুটোই সাদরে গ্রহণ করব। শুধু এইটুকু বলব, অসমের বাইরে এনআরসি বাস্তবায়নের চেষ্টা করার আগে অবশ্যই অসমের থেকে শিক্ষা নিয়ে যথেষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তর্ক-বিতর্কের পর বিচক্ষণতার সাথেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আর শেষটা অসমের ভূমিপুত্র ভূপেন হাজারিকার একটি গানের কথা দিয়েই করলাম –

“মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না…ও বন্ধু।।”


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন