ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

নব্বইয়ের ক্রিকেট আর আমার কিছু স্মৃতি নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার ফেলে আসা ছেলেবেলার কিছু স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠে চশমার কাঁচটাকে ঝাপসা করে দেয়, সুখ দুঃখের সেই স্মৃতিটুকুর উপর ভর করেই এই লেখাটি লিখলাম। আশাকরি এই “নব্বইয়ের ক্রিকেট আর আমার কিছু স্মৃতি” আপনাদের ফেলে আসা স্মৃতিকেও সমানভাবে উস্কে দেবে।

যে সময়টার কথা বলছি, সেই সময় আমাদের বাড়ীতে ওই দরজাওলা টি ভি ছিল, আর সেই বোকা বাক্স তে চ্যানেল বলতে শুধু দুটো ডি ডি ১ আর ডি ডি মেট্রো, হ্যাঁ তখনও আমাদের বাড়ীর দরজায় কেবিলের তারের সাথে বিশ্বায়নের টোকা পড়েনি। তখনও বাড়ীতে “ফোন” বলতে ওই চাকা ঘোরানো বি এস এন এল এর ল্যান্ডফোন যা এখন প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটি আর্টিফ্যাক্টে পরিণত হয়েছে, তখন “ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট” বলতে পাড়ায় নতুন আসা সমবয়সীর খেলতে নেওয়ার আবদার, “আনফ্রেন্ড” একমাত্র তখনই সম্ভব ছিল যখন কাউকে ব্যাট থাকা সত্বেও খেলতে না নিয়ে দুধে ভাতে করে রাখা হত, “শেয়ার” বলতে বুঝতাম ১টাকা, ২টাকা, ৫টাকা সকলে মিলে ভাগাভাগি করে রবারের বা ক্যাম্বিসের ক্রিকেট বল কেনা, আর “ফলো” বলতে ছিল কোনো এক বিকেল বেলায় সাইকেলে চড়ে একে অপরকে অনুসরণ করে একটু পাড়ার চৌহদ্দির বাইরে যাওয়ার আনন্দ।


আরো পড়ুন – যখন ছোট ছিলাম !


নব্বইয়ের ক্রিকেট আর আমার কিছু স্মৃতি
চিত্র সূত্রঃ Wikimedia Commons

নব্বইয়ের ক্রিকেট আমার বড় হওয়ার সাক্ষী, আমায় খবরের কাগজ পড়তে শিখিয়েছে(পিছনের পাতা), যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ সব এই নব্বইয়ের ক্রিকেটই শিখিয়েছে।


এই নীল গ্রহে ক্রিকেট বলে কোনো খেলা হয় প্রথম বুঝলাম ১৯৯৬ এর বিশ্বকাপের সময়, তখন আমি মাটির সাথে কথা বললেও আবছা স্মৃতি এখনও চোখের সামনে ভাসে, ওই বিশ্বকাপের থিম সং টা এখনও কানে বাজে “Will’s World Cup 96, share the magic” বিনোদ কাম্বলির কান্না এখনও ভুলতে পারিনি !

এরপর নদীর স্রোতের প্রবাহের সাথে আমিও ধীরে ধীরে “ছোট্ট বাবাই” থেকে “কমপ্ল্যান বয়” হয়ে উঠছি আর আলীক পদমসির হাত ধরে ভারতীয় বিজ্ঞাপনের বাজারও ধীরে ধীরে সাবালক হয়ে উঠছে। এখানে যাঁরা ৯০ এর দশকের আছেন তাদের আশাকরি ক্যাডবেরি ডেয়ারি মিল্কের বিজ্ঞাপনটার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে !


ভারতীয় দলে তখন দ্রাবিড় আর দাদার সুযোগ পাওয়ার সাথে নতুনের হাওয়া বইতে শুরু হল। কিন্তু হলে কি হবে আমি তখন শচীন রমেশ টেন্ডুলকারের ভক্ত থুড়ি “অন্ধ ভক্ত” বললেও বোধহয় বাড়াবাড়ি হবেনা। স্কুল থেকে ফেরার পথে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ক্রিকেটের ভগবানের ইয়া বড় একখানা ছবি কিনে বাড়ীতে টাঙিয়েছিলাম।

ওই সময়ের ক্রিকেটে চার, ছয় বা আউট হলে বাউন্ডারির ধারে স্বল্পবসনা নারীদের হাতে পমপম নিয়ে নাচানাচি করে দর্শকদের বিনোদন যোগানোর দরকার হত না, কারণ ওই সময়ে ক্রিকেট দেখিয়ে দর্শকদের পর্যাপ্ত অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণের দায়িত্ব ছিল সেই সময়ের সব দিকপাল খেলোয়াড়দের হাতে।


ভারতীয় দলে তখন শচীনের পুল, কপি বুক কভার ড্রাইভ, বোলারর মাথার উপর দিয়ে ছয় বা লেট কাট, দাদার অফসাইডে কভার ড্রাইভ বা “বাপি বাড়ি যা”, টেস্ট ক্রিকেটের ক্ষেত্রে জ্যামি ওরফে রাহুল দ্রাবিড়ের উইকেটে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকা, আজহারউদ্দিনের কব্জির মোচড়ে মিড উইকেটের উপর দিয়ে ফ্লিক বা কলার তুলে সেকেন্ড স্লিপ বা গালিতে ফিল্ডিং, তরুণীদের হার্টথ্রব অজয় জাদেজার খামখেয়ালী উপস্থিতি, রবিন সিংয়ের পয়েন্টে ফিল্ডিং, অপেক্ষাকৃত দুর্বল অথচ হার না মানা অনিল কুম্বলে এবং সুনীল যোশী বা জাভাগাল শ্রীনাথ এবং ভেঙ্কটেশ প্রসাদের বোলিং জুটি এখনও চোখে লেগে আছে।

ঠিক তেমনই, পাকিস্তানের সঈদ আনোয়ার এবং আমীর সোহেলের ওপেনিং জুটি যেকোনো বোলারদের ম্যাচের আগের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। এর সাথেই আরো যাদের মুখ ভেসে উঠছে তারা হল, সেলিম মালিক, ইজাজ আহমেদ, ইঞ্জামামের ঝুঁকে ব্যাট করা, চির যৌবন ধরে রাখা শাহীদ আফ্রিদি(আমি যখন স্কুলে পড়ি তখনও ওর বয়স ১৭ ছিল, যখন কলেজে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকছি তখনও দেখি ওর বয়স ১৭!) সাকলাইন মুস্তাকের, মুশতাক আহমেদ, ওয়াসিম আক্রম, ওয়াকার ইউনিসের ডেলিভারি মনের কোণে বিশেষ ভাবে রয়ে গেছে।

বৃষ্টির দিনে স্কুলের ব্রেকে বন্ধুদের সাথে ট্রাম্প কার্ড খেলার সময় যখন অস্ট্রেলিয়ার ওয়া ব্রাদার, মাইকেল বিভান, শ্যেন ওয়ার্ন, ম্যাকগ্রা, গিলেস্পির কার্ড হাতে আসতো নিজেকে রাজা মনে হত!

আমার দেখা সেরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ওই সময়ই ছিল, কে নেই সেই দলে ব্রায়ান লারা, চন্দ্রপল, রিচি রিচার্ডসন, রজার হার্পার, কার্ল হুপার, কোর্টনি ওয়ালশ, কার্টলি অ্যামব্রোজের মতো সব বাঘা বাঘা খেলোয়াড়।

দক্ষিণ আফ্রিকার চোকার্স বদনাম থাকলেও ওদের আল্যান ডোনাল্ড, ব্রায়ান ম্যাকমিলান বা পল অ্যাডামসের বিষাক্ত স্পেল, পয়েন্টে দাঁড়িয়ে জন্টি রোডসের চিলের মতো ঝাঁপ দেওয়াকে অনুকরণ করতে গিয়ে যে কতবার কনুই ছোড়েছে তার কোনো ইয়োত্তা নেই! অ্যান্ড্রু হাডসন আর গ্যারি কার্স্টেনের ওপেনিং জুটি বা স্লগ ওভারে ল্যান্স ক্লুজনারের তারু ব্যাটের কথা কেই বা ভুলতে পারে?

ওই সময়ের সনথ জয়সূর্য, অরবিন্দ ডি সিলভা, রানাতুঙ্গা, কালুবিথারানা, মুরলিধরন, চামিন্ডা ব্যাসের শ্রীলঙ্কাও কোনো দল কে ছেড়ে কথা বলত না।

নিউজিল্যান্ডের ক্রিস কেয়ার্নস, ক্রিস হ্যারিস থেকে শুরু করে ডানিয়েল ভিত্তরি, ডিয়ন ন্যাশ সকলের খেলাই অনেক প্রানবন্ত ছিল।

আফ্রিকা মহাদেশের গরীব দেশ হওয়া সত্বেও ফ্লাওয়ার ব্রাদার, হিথ্ স্ট্রিকের জিম্বাবোয়ে বা মরিস উদুম্বে, স্টিভ টিকলোর কেনিয়ার লড়াই করার মানসিকতা আজও আমাকে ভাবিয়ে তোলে।


তখন খেলা বলতে ছিল দিনের/ দিনরাতের ওয়ানডে খেলা আর টেস্ট।

টুর্নামেন্ট বলতে এইমুহুর্তে মনে পড়ছে শারজাহ কাপ, ইন্ডিপেন্ডেনস কাপ, বছরের একটা সময় কানাডার টরন্টোতে ভারত পাকিস্তানের পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ হত, এছাড়া বিশ্বকাপ ও বিভিন্ন দেশের সাথে ওয়ান ডে বা টেস্ট খেলা।


মনে আছে ১৯৯৯ এর ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের সময় বাড়ীতে প্রথম কালার টি ভি এলো, কেবলের তারও এলো। ওই সময় “ব্রিটানিয়া খাও ওয়ার্ল্ড কাপ যাও” এর ফাঁদে পড়ে বাড়ীতে ব্রিটানিয়ার বিস্কুটের ছোটোখাটো পাহাড় তৈরি করে ফেলার পরও বুকলেট স্ক্র্যাচ করে “Better Luck Next Time” দেখে মন ভেঙে গিয়েছিল !

ওই বিশ্বকাপেই টনটনের মাঠে শ্রীলঙ্কার ভয়ংকর বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে দাদা আর দ্রাবিড়ের অসাধারণ জুটি কেই বা ভুলতে পারে ! ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে যখন প্রথমবারের জন্য বিশ্বক্রিকেটের মঞ্চে উঠে এসে আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে আক্রম খান, এনামুল হক, খালেদ মাসুদ সহ এগারো জন বাঙালী পাকিস্তানের মতো দুঁদে টিম কে হেলায় হারিয়ে দিল আমি তখন চেঁচিয়ে পাড়া মাত করেছিলাম !


সত্যি বলতে এই রেশ ২০০৭/০৮ অবধিও ছিল কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, এর পিছনে অনেক কারণ আছে যেমন দাদার টিম থেকে বাদ পড়া, আই পি এল নামক সার্কাসের আবির্ভাব, অত্যাধিক কমার্শিয়ালাইজেশন, ইত্যাদি। এখন ভাবলেও অবাক লাগে বিদেশী দল তো ছেড়েই দিন নিজের দেশের হাতে গোনা কয়েকজন ক্রিকেটার বাদে কারুর নাম জানিও না আর জানার আগ্রহও তেমন নেই !


ইশ ! বড্ড তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলাম !

ছেলেবেলার স্মৃতি নিয়ে এরকমই আরেকটি লেখা যখন ছোট ছিলাম, চাইলে পড়ে দেখতে পারেন নিজের ছেলেবেলার সাথে মিল পেলেও পেতে পারেন।


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন