খেরোর খাতা

মানসিক অবসাদ : মনের অসুখ, দুঃখ বিলাস নয়!

ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

মানসিক অবসাদ, এই শব্দবন্ধটি এখন নেট দুনিয়া তোলপাড় করে চলেছে। সম্প্রতি বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত এই মানসিক অবসাদ থেকেই আত্মহত্যার পথটি বেছে নিতে বাধ্য হন, অন্তত বিভিন্ন পত্র পত্রিকার কানাঘুষো থেকে তেমনই ইঙ্গিত মিলেছে।

সুশান্তের মতন প্রতিভাবান তারকার এই অকস্মাৎ মৃত্যুর পর থেকেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন হঠাৎ করে সকলে একবাক্যে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, মানসিক অবসাদ আসলে মনের অসুখ, দুঃখ বিলাস নয়! কিন্তু এর কতটুকু তারা উপলব্ধি করে ফেসবুক বা টুইটারের দেওয়াল জুড়ে এমন পোস্ট পোস্টাচ্ছেন, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান !

আচ্ছা কে বা কারা সুশান্ত সিং রাজপুতকে এই নির্মম পথ বেছে নিতে বাধ্য করল? তাঁর মৃত্যুর জন্য কি শুধু বলিউডের কিছু লবি দায়ী? নাকি এই গোটা সমাজটাই দায়ী?

তাঁর এই মৃত্যু কিন্তু আমাদের অনেকগুলি প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিল !

মানসিক অবসাদ
Image by John Hain from Pixabay

এই অভিশপ্ত বছরেরই একেবারে গোড়ার দিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া অস্ট্রেলিয়ার কোয়াডেন বেলেসের কথা মনে আছে? ন’বছরের এই কিশোরটির “আত্ম” সম্পর্কে কোনো ধারণা গড়ে ওঠার আগেই আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। সে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এই নোংরা, পচনশীল সমাজ থেকে মুক্তি পেতে চরমতম পথটি বেছে নেওয়ার কথা বারবার বলছিল।

কোয়াডেন বেলেস, সুশান্ত সিং রাজপুত, বা আমার আপনার আশেপাশে আরো এরকম নাম না জানা মানুষগুলো কেন এই পথ বেছে নিতে চায়?

মানসিক অবসাদ জনিত রোগের অনেক কারণ থাকতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে ব্যুলি করা, অস্ট্র্যাসাইজ বা একঘরে করে দেওয়া অন্যতম প্রধান কারণ। যখন কোনো মানুষকে প্রতিনিয়ত এগুলির সম্মুখীন হতে হয়, তখন ভিতরে ভিতরে সে কুঁকড়ে যায়, তার মনোবল ভেঙে পড়ে, ধীরে ধীরে নিজেকে লোক সমাজে “খিল্লি” হওয়া থেকে বাঁচাতে একা থাকতে শুরু করে আর সব শেষে বিষন্নতার কাছে আত্মসমর্পণ করে মুক্তির চরম পথটি বেছে নিতে বাধ্য হয়।


শৈশবের স্কুল থেকে বড় বয়সের কর্মক্ষেত্র, সব জায়গাতেই মানসিক ও শারীরিক ভাবে একটু দুর্বল হলেই তার ওপর চলতে থাকে মনুষ্য সমাজের এক পৈশাচিক আচরণ, সমাজ যার একটা গাল ভরা নাম দিয়েছে, ব্যুলিং, সেটা হতে পারে শারীরিক গঠন কেন্দ্রিক, তোতলামি কেন্দ্রিক, বর্ণ, ইত্যাদি। এর সাথেই পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে অস্ট্র্যাসিজম বা একঘরে করে দেওয়া। এমনিতে আমাদের পারিপার্শ্বিক সমাজে হরহামেশাই দেখা যায় যে পারস্পরিক মতানৈক্যের কারণে একে অপরকে সামাজিকভাবে একঘরে করে দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে।

একটি বিদেশী গবেষণাপত্র বলছে,

“Adolescents who are being bullied and those who are bullies are at an increased risk of depression and suicide. The need for psychiatric intervention should be considered not only for victims of bullying but also for bullies.”

Bullying, depression, and suicidal ideation in Finnish adolescents: school survey

অন্যদিকে আরেকটি গবেষণাপত্র থেকে জানা যাচ্ছে, “perceived meaning in life had a distinct mediating role in the ostracism-suicidal thinking link.” 


জীবন নামক এই বন্ধুর পথের চড়াই উৎরাই এর কোন না কোন বাঁকে এই মানসিক অবসাদ বা বিষন্নতা সকলকে পেয়ে বসে। মানসিক অবসাদের চোখরাঙানি থেকে বাদ যাননি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও, কোনো এক সময়ে তাঁর মনেরও কোনো এক কোণে জমে উঠেছিল মন খারাপের দিস্তা !

দাড়ি বুড়োর সেই মন খারাপের দিস্তা থেকেই একটা চিঠির উল্লেখ এখানে করলাম –

২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪। শ্রীনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে লিখলেন, ইউনানি ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে তাঁর শারীরিক সমস্যা দূর হলেও কিছু মানসিক উপসর্গ দেখা দিয়েছে।

চিঠিতে লিখলেন, ‘মেটিরিয়া মেডিকা’ পড়ে নিজের সেই সব উপসর্গ চিহ্নিত করতে পেরেছেন, যা মূলত, অবসাদ, মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা, কান্নার তাগিদ, হতাশা, আত্মহত্যার প্রবণতা, আক্রোশ ইত্যাদি। তিনি, চিঠিতে রথীন্দ্রনাথকে লিখলেন, ‘‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করেছে. মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবেনা। আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ…।’’


আরো পড়ুন – ৮০ তে আসিও না । বার্ধক্যের প্রতিচ্ছবি


মানসিক অবসাদ, হতাশা বা বিষন্নতা নামক শব্দের সাথে আমরা সকলেই পরিচিত, কিন্তু আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রায়শই একে উপেক্ষা করে চলি! ফেসবুকের হাস্যজ্জ্বল ছবির পিছনের মানুষটা আদেও ততটাই সুখী কিনা তার খোঁজ আর নেওয়া হয়না — আর ঠিক এই কারণেই সোশ্যাল মিডিয়ায় অগুনিত অনুগামী থাকা সত্বেও সুশান্ত সিং রাজপুতের মতো এমন কত হৃদ স্পন্দন অকস্মাৎ থেমে যায়।

আমরা প্রতিনিয়ত নিজের সাথে, পরিবারের সাথে, বন্ধুদের সাথে শুধুই ভালো থাকার অভিনয় করে চলি। আমরা কিছুতেই বুঝতে চাইনা যে, মানসিক অবসাদ আসলে মনের অসুখ, দুঃখ বিলাস নয়! যা পেট ব্যাথা, মাথা ব্যাথা, রক্তচাপ জনিত রোগের মতই একটি রোগ। এই পর্যায় ওই রুগীর সহমর্মিতার প্রয়োজন। প্রয়োজন একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শের প্রয়োজন পরে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজে মনরোগ ব্যাপারটাই প্রবলভাবে উপেক্ষিত !

যখনই কোনো মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকা রুগী তাঁর মানসিক যন্ত্রণা আর সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, ঠিক তখনই আমাদের মতো “সবজান্তা” ফেসবুকীয় বিশেষজ্ঞরা আমাদের মহামূল্যবান সময় “কেন অমন করল? কী করা উচিত ছিল” ইত্যাদি গোছের মতামত দিয়ে তা অপচয় করতে তৎপর হয়ে উঠি।

অথচ যখন একজন ব্যক্তি মানসিক যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে কাউকে তাঁর আপনজন ভেবে কিছু বলতে যায় তখন কখনো তাঁর কষ্টটা হয়ে ওঠে পাগলের প্রলাপ, দুঃখ বিলাস, আবার কখনো সে শিক্ষিত সমাজের কাছে হয়ে ওঠে বিরক্তির কারণ !

মানসিক অবসাদ আসলে মনের অসুখ, দুঃখ বিলাস নয়! এই সহজ সত্যটা যে নীল গ্রহের সবচাইতে বুদ্ধিমান প্রাণী বলে দাবী করা মনুষ্য জাতি কবে উপলদ্ধি করবে, কে জানে !


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

Previous

নব্বইয়ের ক্রিকেট আর আমার কিছু স্মৃতি

Next

ডার্ক চকোলেট – তৃপ্তি ও অতৃপ্তির মেলবন্ধন

2 Comments

  1. অনিকেত লেখাটা মন ছুঁয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা যদি না পড় ধরা !!