ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

এই বছরের জুন মাসে কভিড অতিমারির কারণে যখন দেশ জুড়ে লকডাউন পর্ব চলছিল, তখন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি সংস্কার সম্পর্কিত ৩টি অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। লকডাউনের সময় জারি করা ওই ৩টি অধ্যাদেশকে প্রতিস্থাপনের জন্য সংসদে কৃষি সংস্কার সম্পর্কিত তিনটি কৃষি বিল উত্থাপন করা হয়েছিল যা 

  • ফারমার্স প্রোডিউস ট্রেড অ্যান্ড কমার্স (প্রোমোশন অ্যান্ড ফেসিলিটেশন) বিল ২০২০
  • ফারমার্স (এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রটেকশন) এগ্রিমেন্ট অব প্রাইস অ্যাসিওরান্স অ্যান্ড ফার্ম সার্ভিসেস বিল, ২০২০
  • এসেনশিয়াল কমোডিটিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল বা অত্যাবশ্যক পণ্য আইন

কৃষি বিল
চিত্র সূত্রঃ Wikimedia Commons

সম্প্রতি ভারতীয় সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হলে পরে, লোকসভায় সরকার পক্ষ তাঁদের গানিতিক সমীকরণের জোরে, পর্যাপ্ত আলোচনা সমালোচনা ছাড়াই ৩টি কৃষি বিল পাশ করিয়ে নেয়। আর পরবর্তীতে সংসদীয় গনতান্ত্রিক পদ্ধতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ধ্বণি ভোটের মাধ্যমে রাজ্যসভাতেও তা পাশ করিয়ে নেয়। কিছুদিন আগে মাননীয় রাষ্ট্রপতিও তাঁর মূল্যবান কলমের আঁচড়ে তিনটি বিলে শিলমোহর দিয়ে দেন। তাই নিয়ম অনুযায়ী এই ৩টি কৃষি বিল এখন আইনে পরিণত হয়ে গেছে।

গত জুলাই মাসে সরকারের এই কৃষক দরদী অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকরা ট্র্যাক্টর নিয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে এই অধ্যাদেশের বিরোধিতা করেছিল। গত ২৮ আগস্ট পাঞ্জাব সরকার কৃষক সম্প্রদায়ের বাড়তে থাকা ক্ষোভ অনুভব করে পাঞ্জাব বিধানসভা কেন্দ্রের অধ্যাদেশকে প্রত্যাখ্যান করে একটি প্রস্তাব পাস করে।

সংসদের বাদল অধিবেশনে এই কৃষি বিলগুলি উপস্থাপিত হলে পরে দেশ জুড়ে কৃষক ও কৃষক সমিতির প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পরে। সেই প্রতিবাদের গর্জন শুধু বাম, কংগ্রেস, তৃণমূলের প্রতিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলনা, তা দলীয় গন্ডির বেড়া জাল টপকে এনডিএ শরিকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পরেছিল, তাঁদের মধ্যে অকালি দল ও আরএসএস সমর্থিত “ভারতীয় কিষান সংঘ” এবং “স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ”-র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কৃষি সংস্কার সংক্রান্ত এই তিনটি কৃষি বিল এভাবে পাশ হয়ে যাওয়ার দরুণ বিরোধীরা তো বটেই এমনকি সরকারপক্ষের অকালি দলও কৃষি বিল নিয়ে ঘর পোড়া গরুর মত সিঁদুরে মেঘ দেখছেন।


আরো পড়ুন – এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট । পরিবেশ ধ্বংসের খসড়া !


এই ৩টি কৃষি বিল নিয়ে এত বিতর্ক কেন ? কী এমন রয়েছে এই ৩টি বিলে ?

ফারমার্স প্রোডিউস ট্রেড অ্যান্ড কমার্স (প্রোমোশন অ্যান্ড ফেসিলিটেশন) বিল ২০২০

এই আইনে মূল যে বিষয়গুলো আসে সেগুলো হল—

  • কৃষকের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে চুক্তি ভিত্তিক চাষ
  • পচনশীল পণ্যের জন্যে নির্দিষ্ট বাজার ব্যবস্থা
  • কৃষকদের নিজেদের উদ্যোগে বাজার তৈরির উৎসাহ দেওয়া, এমনকি ব্যক্তি মালিকানাতেও যাতে এই বাজার তৈরি হতে পারে তার ব্যবস্থা করা
  • কৃষির উপর সরকারি নিয়মের রাশ শিথিল করা
  • কৃষি বাজার থেকে আসা নানান কর ও সেস থেকে কোষাগারে আসা রাজস্ব দিয়ে কৃষি বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়।

কৃষি বিপণন ব্যবস্থাকে মান্ডির ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে মুক্তি দিতেই এই আইন। মান্ডি কিন্তু উঠে যাচ্ছে না, মান্ডি থাকছে। শুধু এই কৃষি বিল, আইনে রুপান্তর হলে পরে, কৃষকের তার পণ্য শুধুমাত্র মান্ডিতেই বিক্রি করার কোনও দায় থাকবে না, সে যেখানে চাইবে সেখানে তার কৃষি পণ্য বিক্রি করতে পারবে। এছাড়াও এই আইনের ফলে কৃষি পণ্য চলাচলের উপর রাজ্যের আর কোনও অধিকার থাকবে না। মান্ডির বাইরে কৃষিপণ্য লেনদেনের উপর কোনও সেস বা কর বসানোর অধিকারও আর থাকবে না রাজ্যগুলির।

কিন্তু এখানেই মূল খটকা। আর সেগুলি হল –

এতদিন কৃষি মান্ডি গুলি থেকে রাজ্যের একটা নির্দিষ্ট আয় হত, কিন্তু কেন্দ্র এরকমভাবে এক এক করে রাজ্যের হাত থেকে আয়ের সব রাস্তা কেড়ে নিলে পরে, সেই রাজ্যগুলির কেন্দ্রের কাছে হাত পাতা ছাড়া আর কোনো গতি থাকবে না।

মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসের (এমএসপি) মূল ভিত্তিটাই ছিল, কৃষকদের ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলানোর ন্যায্য মূল্যটা অন্তত দেওয়া, তার থেকে যাতে কোনও কৃষককে বঞ্চিত না হতে হয়। ২২ টা ফসলের উপর কেন্দ্র থেকে এমএসপি ধার্য করা হত। তাই ক্রেতাকে ওই মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসের উপরেই কৃষি পণ্য ক্রয় করতে হত। মান্ডি ব্যবস্থা ছিল কৃষকের হাতে সেই দাম তুলে দেওয়ার প্রকৃষ্ট ব্যবস্থা। কিন্তু নতুন আইনে এই দাম পাওয়ার অধিকার কী ভাবে রক্ষা করা হবে তা কৃষি বিল বা নব্য কৃষি সংস্কার আইনের কোথাও স্পষ্ট করে বলা হয়নি। আর এখানেই খটকা জাগিয়ে আসছে দ্বিতীয় আইনটির প্রসঙ্গ।


ফারমার্স (এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রটেকশন) এগ্রিমেন্ট অব প্রাইস অ্যাসিওরান্স অ্যান্ড ফার্ম সার্ভিসেস বিল, ২০২০

কেন্দ্রের এই দ্বিতীয় আইনটিতেই আসছে চুক্তি চাষের কথা। আইনে কী ভাবে কৃষক ও ক্রেতার (এক্ষেত্রে কর্পোরেট সংস্থা) মধ্যে চুক্তি হবে তার একটা রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী কৃষকরা চুক্তি মেনে চাষ শুরু করার আগেই ক্রেতার (কর্পোরেট সংস্থা) সঙ্গে কথা বলে দাম নির্ধারণ করবে। কী ভাবে সরবরাহ করা হবে, গুণমান কী হবে, ইত্যাদির কথা থাকবে সেই চুক্তিতে। ওই চুক্তির ভিত্তিতেই দু’পক্ষ লেনদেন করতে বাধ্য থাকবে।

মানে সরল করে বলতে গেলে ধরুন আপনি একজন পটাটো চিপ্স কোম্পানির(ধরি, রাঙাকাকা চিপ্স) মালিক। এবার “রাঙাকাকা চিপ্স” সরাসরি গিয়ে কৃষকের সাথে চুক্তির মাধ্যমে তার জমি নেবে এবং কৃষক চুক্তি অনুযায়ী সেই জমিতে শুধু আলু চাষই করে যাবে আর তার বদলে চুক্তি অনুযায়ী ধার্য মূল্য পাবে।

এবার এখানে প্রথম প্রশ্ন হল সেই দাম নির্ধারণের ভিত্তি কি হবে ? কারণ এই আইনে কোথাও দাম নির্ধারণের ভিত্তি কী হবে সেই প্রসঙ্গে কোনও উচ্চবাচ্য নেই।

এর ফলে কর্পোরেটের চাহিদা পুরণ করতে গিয়ে যদি প্রচুর জল শোষণকারী বীজের চাষ করা হয় তাহলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নামতে নামতে একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকবার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায়না। উত্তরপ্রদেশ বা মহারাষ্ট্রের বেশ কিছু অংশে বেশি লাভের জন্য ইক্ষু চাষ করা হয় আর তার ফলে ওইসব অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তরের অবস্থা শোচনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর ঠিক এরমকমটাই যদি এখানে হয়, তাহলে এর ফলপ্রসূ সেই সব অঞ্চলের বেশিরভাগ কৃষি জমিই খরার প্রকোপে পড়তে পারে।

এছাড়াও যে দেশে গড় কৃষিজমির আয়তন ১.০৮ হেক্টর, সে দেশে এক জন কৃষক চুক্তি ভঙ্গ হলে আইন আদালতের খরচ কী ভাবে মেটাবেন? সাক্ষরতার হার যে দেশে তলানিতে, সে দেশে তো আসলে স্বাধীনতা-পূর্ব অবস্থাতেই ফিরতে চলেছি আমরা। তখন জমিদারদের হাতে ঘটিবাটি বেচতে বাধ্য হতেন কৃষকরা, আর এখন বড় ব্যবসায়ীদের হাতে সাধারণ কৃষক স্বার্থ বিক্রি হয়ে যাবে।

সুতরাং এই ফারমার্স (এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রটেকশন) এগ্রিমেন্ট অব প্রাইস অ্যাসিওরান্স অ্যান্ড ফার্ম সার্ভিসেস বিল, ২০২০ নামক কৃষি বিল ও প্রশ্নাতীত নয়।


এসেনশিয়াল কমোডিটিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল বা অত্যাবশ্যক পণ্য আইন

এই বিশেষ কৃষি বিল বা বলা ভালো অত্যাবশ্যক পন্য আইনের বলে চাল, ডাল, তৈলবীজ, পেঁয়াজ ও আলুর মতো অত্যাবশ্যক পণ্য হারাল তাদের অত্যাবশ্যকীয়তা। যার মোটামুটি মানে করলে দাঁড়ায়, এ সব পণ্যের উৎপাদন, গুদামজাত করা বা বিক্রি করার উপর আর কোনও সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকল না।

শুধু তাই নয়, রাজ্যের হাত থেকে আপতকালীন বণ্টন বা কোনও রাশ টানার অধিকারেও কোপ পড়তে চলেছে। এখন থেকে এই সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্তের মালিক হয়ে গেল কেন্দ্র। অর্থাৎ পেঁয়াজের দাম ২০ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে ১০০ টাকায় গিয়ে পৌঁছলে আমাকে, আপনাকে কেন্দ্রের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তে হবে।

এবার এখানেই শেষ নয়। এই কড়া নাড়ার ব্যাপারেও অনেক সাত পাঁচ দেখে, ভেবে নাড়তে হবে। কতটা কেন্দ্রের গুদামে অর্থাৎ এফসিআই(FCI)- এ ধরে রাখা হবে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দামের ওঠা পড়া দেখে। পচনশীল পণ্যের দাম যদি ৫০ শতাংশ আর অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বাড়ে তা হলে সরকার মাঠে নামবে, অন্যথায় নয়।

কিন্তু কত্তা, দেশের সব রাজ্যে কৃষিপণ্যের দাম যে এক ভাবে বাড়ে না ! তা হলে কী ভাবে এই দামের ওঠা-পড়া দেখা হবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন।


সময়ের চাহিদা মেনে কৃষিকে বাজারের সাথে সংযুক্ত করতে, মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণিকে ছেঁটে ফেলে কৃষির সার্বিক আধুনিকীকরণের স্বার্থে সংস্কার অবশ্যই জরুরি। কিন্তু, সেই আধুনিকীকরণের আড়ালে তার অপব্যবহারের আশঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই সরকার যে ভাবে লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে সংসদে একের পর এক বিল এনে, কতিপয় বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে চলেছে, তাতে আতঙ্ক তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

মানুষের দ্বারা নির্বাচিত সরকার, যদি মানুষের সম্মতি ছাড়াই সংস্কার-সিদ্ধান্ত এভাবে চাপিয়ে দিতে থাকে তাহলে তার প্রতিরোধ হওয়াই স্বাভাবিক। আর এর ফলে সংস্কারের আসল উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়।

এই তিনটি কৃষি বিল নিয়ে সংসদের উভয় কক্ষে যথেষ্ট আলোচনা, তর্কবিতর্কের জরুরি ছিল। ভারতের মতন একটি বৃহৎ ও পরিণত গণতান্ত্রিক দেশে, বিরোধীদের কণ্ঠরোধ না করে বরং তাদের কণ্ঠস্বরকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত ছিল। সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটিকে বজায় রাখাটাই কাম্য।

এই বিশেষ “কৃষক দরদী” কৃষি বিল এনে কৃষি সংস্কারের নামে কৃষকের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে কর্পোরেটের হাত শক্ত করা হচ্ছে না তো ?


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন