ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

পশ্চিমবঙ্গে এইমুহূর্তে খেলা হবে নামক শব্দগুচ্ছটি রাজনীতির উঠোন থেকে সোজা বাঙালির বসার ঘরে ঢুকে পড়েছে। ফি দিন এখন বোকা বাক্সতে কান পাতলেই রাজনীতিবিদদের খেলা হবে, খেলা হবে বলে স্লোগান ও টিটকিরি শোনা যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোন পজিশনে খেলবেন তাও জানিয়ে দিয়েছেন। ওনার কথায় স্পষ্ট, গোল যাতে না হয় তাই তিনি খেলবেন গোলরক্ষকের ভূমিকায়।

এদিকে গণতন্ত্রের এতবড় খেলার নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলাতে ইতিমধ্যেই রাজ্যে চলে এসেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী।

খেলা হবে

ভোট এলে প্রতিবারই কোনো না কোনো নতুন স্লোগান নিয়ে ময়দানে নেমে পড়ে রাজনৈতিক দলগুলো।

বিগত লোকসভা ও বিধানসভা ভোট যুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে এমন অনেক স্লোগান উঠে এসেছে, উদাহরণ হিসাবে এইমুহূর্তে যেগুলো মনে পড়ছে, সেগুলো হল, ‘হয় এবার নয় নেভার’ বা ‘এই তৃণমূল আর না’-র মতো স্লোগান মানুষের মুখে মুখে ঘুরেছে ৷ ঠিক তেমনই আবার ‘দিল্লি থেকে এলো গাই, সঙ্গে বাছুর সিপিআই’ বা বহুল প্রচলিত ‘চুপচাপ ফুলে ছাপ’ কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছে৷

এছাড়া সারা বছর ধরেই “দিদিকে বোলো” “আর নয় অন্যায়” থেকে “বাংলার গর্ব” এর মতো নানা ধরনের প্রচার অভিযান চলতেই থাকে। তবে এখনও পর্যন্ত ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে সুপারহিট স্লোগান হল খেলা হবে।

এইমুহূর্তে রাজনীতির ময়দানে “ খেলা হবে ” একমাত্র স্লোগান যা ডান থেকে বাম প্রতিটি রাজনৈতিক দল আপন করে নিয়েছে। যার কারণে কানে বাজছে এই স্লোগান। মিছিলে ডিজে বাজিয়েও চলছে খেলা হবে। এই গানের তালে নাচতেও দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের।

এখন বাংলার আম পাবলিকের মনে কৌতূহল জাগতেই পারে, যে খেলা না হয় হবে, কিন্তু কিসের খেলা হবে ? এই স্লোগানের পেছনে রাজনৈতিক দলগুলিরই বা কী উদ্দেশ্য ?

আসুন আজ খেরোর খাতা তে রাষ্ট্রনীতির চচ্চড়ি গলাদ্ধকরণঃ করতে করতে আমরা বরং আম পাবলিকের এই কৌতূহলেরই উত্তর খুঁজি।


খেলা হবে স্লোগানের মানে কী? 

ভোটের ময়দানে এই স্লোগানের হাজারও ব্যাখ্যা দিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। নানা অন্তর্নিহিত অর্থ বলছেন কেউ কেউ। কারও মতে রাজনীতি কী ছেলেখেলার জিনিস যে খেলা হবে, খেলা হবে স্লোগান চলছে। কেউ কেউ আবার বারুদের মতন এর পিছনে মারদাঙ্গা হিংসার প্রচ্ছন্ন হুমকির গন্ধও শুঁকতে শুরু করেছেন। 

তাহলে মারদাঙ্গা হিংসার আশ্রয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটে লড়বেন, সেটাকেই কি খেলা হবে বলা হচ্ছে? মোদ্দা কথা খেলা নিয়ে সরগরম বাংলার ভোট রাজনীতি। তাতে পিছিয়ে নেই কোনও পক্ষ। 

এখানে উল্লেখ্য, ভোটমুখী বাংলায় বীরভূম জেলার তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের মুখেই প্রথম এই শব্দবন্ধ শোনা যায়। কে জানে ওনার আবার সেদিন মাথায় অক্সিজেন কমে যাচ্ছিল কিনা ! তা নয়তো নকুলদানা খেয়ে যার দিন কাটে সে আবার খেলা হবে বলে বিরোধী দলগুলিকে হুমকি কেন দেবে ? 

এই ঘটনার ঠিক পরেই যুব তৃণমূল নেতা দেবাংশু ভট্টাচার্য খেলা হবে নিয়ে একটি গোটা গান লিখে ফেলেন। যা রাতারাতি সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে ভাইরাল হয়ে যায়। তারপর থেকেই ভোটের বাংলা মাতিয়ে রেখেছে ‘খেলা হবে’ স্লোগান।

অন্যদিকে একটু আঙুলর চাপ দিয়ে গুগল জ্যাঠাকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারা যাবে যে আজ থেকে বছর আটেক আগে, মানে ২০১২-১৩ সালে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শামিম ওসমান সেখানকার একটি রাজনৈতিক সভায় বলেছিলেন, ‘‘কারে খেলা শেখান? আমরা তো ছোটবেলার খেলোয়াড়৷ খেলা হবে!’’ 

শেষের এই শব্দ দুটিই এখন স্লোগান হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে৷


ভোট থুড়ি খেলার নির্ঘন্ট

গত ২৬ শে ফেব্রুয়ারী ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুনীল আরোরা খেলার দিনক্ষণ ঘোষণা করেন।

২৭ শে মার্চ থেকে পশ্চিমবঙ্গে খেলা শুরু হচ্ছে, শেষ হচ্ছে ২৯ শে এপ্রিল। মোট ৮ দফায় লীগ পর্যায়ের খেলা হবে আর ফাইনাল হবে ২রা মে, ২০২১।

খেলা হবে
চিত্র সূত্রঃ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন

প্রথম দফার ভোট ২৭ মার্চ – এই দফায় ভোট হবে ৩০টি আসনে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া-১, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর-১, পূর্ব মেদিনীপুর-১-এ ভোট গ্রহণ হবে।

দ্বিতীয় দফায় ভোট ১লা এপ্রিল – ৩০ টি আসনে হবে। ভোট গ্রহণ হবে, বাঁকুড়া-২, পশ্চিম মেদিনীপুর- ২, পূর্ব মেদিনীপুর- ২, দক্ষিণ ২৪ পরগনা – ১।

তৃতীয় পর্যায়ের ভোট হবে ৬ই এপ্রিল – ৩১ টি আসনে হবে। এই দফায় হাওড়া -২, হুগলি – ২, দক্ষিণ ২৪ পরগনা – ৩, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহারে ভোট নেওয়া হবে।

চতুর্থ পর্যায়ের ভোট হবে ১০ই এপ্রিল – ৪৪ টি আসনে হবে। হাওড়া-২, হুগলি- ২, দক্ষিণ ২৪ পরগনা- ৩, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহারে ভোট গ্রহণ হবে।

পঞ্চম দফায় ৪৫ আসন ভোট হবে ১৭ই এপ্রিল – এই পর্যায়ে ভোট হবে, উত্তর ২৪ পরগনা-১, নদিয়া- ১, পূর্ব বর্ধমান-১ , দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়িতে।

ষষ্ঠ দফায় ভোট হবে ২২শে এপ্রিল – এই পর্যায়ে ভোট গ্রহণ হবে ৪৩ আসনে। যেসব জেলায় ভোট হবে সেগুলো হল উত্তর ২৪ পরগনা-১, নদিয়া- ১, পূর্ব বর্ধমান-১ , উত্তর দিনাজপুর।

সপ্তম দফায় ভোট গ্রহণ হবে ২৬শে এপ্রিল – মালদহ-১, মুর্শিদাবাদ-১, পশ্চিম বর্ধমান, দক্ষিণ দিনাজপুর কলকাতা দক্ষিণে এই দফায় ভোট হবে।

অষ্টম দফায় ভোট হবে ২৯শে এপ্রিল – মালদহ-২, মুর্শিদাবাদ-২, কলকাতা উত্তর, বীরভূমের ৩৫ টি আসনে ভোট হবে।

নির্বাচন কমিশনের তরফে পশ্চিমবঙ্গে ম্যাচ রেফারি থুড়ি পর্যবেক্ষক অজয় নায়েক কে নিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও বাংলায় দুই বিশেষ পর্যবেক্ষক হলেন বিবেক দুবে এবং মৃণালকান্তি দাস।

২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে ৮০ বছরের ঊর্ধ্বের ভোটাররা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।


আরো পড়ুন – বিধান পরিষদ গঠনের বকলমে কী প্রবীণদের ‘পুনর্বাসন’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ?


খেলার জন্য দল গঠন

খেলার জন্য রাজনৈতিক দল গুলির দল গঠনের মাঝেই হঠাৎ লক্ষ্য করা যাচ্ছে কোন এক অজ্ঞ্যাত কারণে হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার বাঁশির সুরে সম্মোহিত হয়ে এক এক করে তৃণমূল ছেড়ে মূরলীধর স্ট্রিটের ছোট্ট ঘরটিতে গিয়ে উঠছেন।

এই প্রসঙ্গে বাংলার বহুল প্রচলিত প্রবাদটির কথা মনে পড়ে যায়, “যদি হও সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন”।

খেলার দর্শকদের ভূমিকা

খেলা হবে

যাইহোক বাংলার গণতন্ত্র প্রেমী মানুষ চায় সুষ্ঠু ভাবে অবাধ ও শান্তিপুর্ণ নির্বাচন হোক। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গ সর্বস্তরের খেলায় পিছিয়ে পড়তে পড়তে এখন প্রায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতন অবস্থা। তাই পশ্চিমবঙ্গের জনগণ চায় যেই দলই খেলায় জিতুক আখেরে যেন তা বাংলাকে গৌরবান্বিত করতে সাহায্য করে।

এই খেলায় রাজনৈতিক দলগুলো যদি বাংলার জনগণকে শুধু দর্শক হিসাবে দেখে তাহলে কিন্তু ভুল হবে, তারা যেন মনে রাখে এই খেলার শেষে সিদ্ধান্ত কিন্তু জনগণের একটা আঙুলের চাপেই হবে।


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন