খেরোর খাতা

যখন ছোট ছিলাম !

ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

সত্যি বলতে সূর্যের চারিদিকে এতগুলি বার প্রদক্ষিণ করার পরেও ছোটবেলার ফেলে আসা সেই দিনগুলির দিকে তাকালে একইসাথে দুঃখ আর আনন্দ এই দুই অনুভব যেন মনটাকে আস্টে পৃষ্টে ধরে থাকতে চায়। মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে আসে ইশ! দিনগুলি কি ভালোই না ছিল যখন ছোট ছিলাম !

আমার ছোটবেলাটা ৯০র দশকের তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী দশকের বেড়ে ওঠা বাচ্চাদের থেকে একটু হলেও আলাদা।

যখন ছোট ছিলাম !
চিত্র সূত্রঃ Wikimedia Commons

বোকা বাক্স তে বন্দী

যখন ছোট ছিলাম !
Photo by Anete Lusina from Pexels


তখন সদ্য বিশ্বায়নের হাত ধরে কেবলের তার বাড়িতে ঢুকবে ঢুকবে করছে, যার সাহায্যে নাকি বাড়ির সকল কে “বোকা বাক্স তে বন্দী” করে রাখা যায় সেই “আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ” এর মত।

আর আমার মত আরো যারা সদ্য শৈশব পেরিয়ে কৈশোর জীবনের পথে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলেছিলাম তারা ইস্কুলের গ্রীষ্মের আর পুজোর ছুটির দিকে চাতক পাখির মত অপেক্ষায় থাকতাম।

ছুটি-ছুটি


যদিও ছুটি শুধু প্রহসন মাত্র, কারণ শুধুমাত্র ইস্কুলের ছুটির কাজ শেষ করতে হবে বলে ফি দিন ভোরবেলা মা অতি সযত্নে ফ্যান বন্ধ করে আমাকে ও আমার দিদি কে ঘুম থেকে তুলে দিত। তখনও সুকান্ত ভট্টাচার্যের “আঠারো বছর বয়স” পড়ে হয়ে ওঠা হয়নি, নচেৎ বিদ্রোহ অবধারিত ছিল!!

অগত্যা বাধ্য ছেলে ও মেয়ের মত আমরা মা’র আদেশ পালন করার পর ১০ টা বাজার অধীর অপেক্ষায় থাকতাম, কারণ তখন ১০ টা থেকে এফ এম গোল্ড চ্যানেলে বা এফ এম রেনবো তে “ছুটি ছুটি” বলে একটি অনুষ্ঠান হতো আর তারপর “গল্প দাদুর আসর”।

বেলা সাড়ে এগারোটা থেকে আবার দূরদর্শন এ “ছুটি ছুটি” দেখাতো, সেখানে “লাল কমল নীল কমল” থেকে শুরু করে “গুপি গাইন বাঘা বাইন”, “হীরক রাজার দেশে” (যদিও তখন অত বুঝিনি, কিন্তু এখন এই দুটি ছবি যখনই দেখি তখনই মুগ্ধ হই এই ভেবে যে সমাজের কত কঠিন সমস্যা গুলিকে কত সরল ভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন স্বনামধন্য সত্যজিৎ রায় এবং তা আজও কত প্রাসঙ্গিক!)।

ফেলু মিত্তির থেকে ব্যোমকেশ


আর ওই ছুটি ছুটির হাত ধরেই সন্ধ্যা শশী বন্ধু থুড়ি প্রদোষ চন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদার সাথে প্রথম পরিচয় আর তারপর একে একে কাকাবাবু, অর্জুন, পাণ্ডব গোয়েন্দা, টিনটিন আর সব শেষে শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সীর সাথে।

দুপুরের ফেরিওলা


দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়ার পর আমার সেজো পিসির কাছে নানান গল্প শোনার সাথে সাথে আইস্ক্রিম দাদুর “আ – ই – স্ক্রি – ম” বলে হাঁকের অপেক্ষায় থাকতাম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই হাঁকটাও ইঁট কাঠ পাথরের জঙ্গলে চাপা পড়ে গেছে!

আমটি আমি খাবো পেড়ে


বাড়ির পাশে একটা আম গাছ ছিল আর প্রতি বছরই গাছটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ — “বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলেন পরিচিয়তে” একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলত। আর তার জেরে প্রতিদিন দুপুরে পাড়ার ছেলেদের সার্জিকাল স্ট্রাইক রীতিমতো রুটিনে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। তখন বিরক্ত লাগলেও এখন গাছটি না থাকায় ওই বিরক্তিকর উপদ্রব টাকেই যেন বাড়ির সকলে মিস করি।

ভি. সি. আর. থেকে নেটফ্লিক্স


ভি.সি. আর. নামক এক আদিম যন্ত্রের হাত ধরে সাউন্ড অফ মিউজিক, মেরী পপিনস, গান্স অফ নাভারন, দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কয়াই, ইত্যাদি পাশ্চাত্য সিনেমার সাথে পরিচয় যা পরবর্তী কালে ভি.সি. ডি. , ডি.ভি.ডি. হয়ে এখন দিল্লী তে নেটফ্লিক্স এ এসে ঠেকেছে।

এত সুর আর এত গান

যখন ছোট ছিলাম !
Photo by Stas Knop from Pexels


তৃতীয় সুর আর ষষ্ঠ সুর এর বাইরেও যে আরো পাঁচটা সুর আছে এবং তাদের মিলনে যে অদ্ভুত সুন্দর সব গানের সৃষ্টি হতে পারে তা অল ইন্ডিয়া রেডিও, সাগরিকা, আর সেই হিজ মাস্টার্স ভয়েসের সারমেয়টি না থাকলে হয়েতা অজানাই থেকে যেত আর সেই সাথে ভালো গান শোনার রুচি টাও হয়তো তৈরি হত না! কিন্তু কালক্রমে সেই ক্যাসেটের পেঁচিয়ে যাওয়া রীল কে ঠিক করে টেপ রেকর্ডারে চালিয়ে গান শোনার আনন্দটা আরো অনেক কিছুর মতোই যেন ইন্টারনেট নামক মায়াজালের আড়ালে নিঃশব্দে হারিয়ে গেল!!


আরো পড়ুন – নব্বইয়ের ক্রিকেট আর আমার কিছু স্মৃতি


অনেকটা ক্যাকটাসের হলুদ পাখির মতো —

“…একদিন গেল উড়ে
জানি না কোন সুদুরে
ফিরবে না… সেকি ফিরবে না…
ফিরবে না আর কোনদিন…”

ইশ! দিনগুলি কি ভালোই না ছিল যখন ছোট ছিলাম !


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

Previous

NRC খায় না মাথায় দেয় ?

Next

পণ প্রথা ও আমাদের সমাজ ব্যবস্থা

2 Comments

  1. চমৎকার তো!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা যদি না পড় ধরা !!