ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

এই কভিড অতিমারি আর লক ডাউনের বাজারে অ্যামাজন প্রাইমের ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সুজিত সরকারের ছবি গুলাবো সিতাবো যেন একটা দমকা হাওয়ায় মতো। সুজিত সরকারের দক্ষ হাতে তোলা সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে ধরা পড়ছিল মায়াবী লখনৌ নগরীর রোজনামচা, যা লখনৌ এর বিরিয়ানির মতই সুস্বাদু।

গুলাবো সিতাবো
ইলাস্ট্রেশন অনিকেত ভাদুড়ী

যখন ভারতবর্ষের শেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেনের কথা মত র‍্যাডক্লিফ সাহেবের স্ক্যালপেল সুনিপুণ ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে একটি নতুন, স্বাধীন ভারতের জন্ম দিল। ঠিক তার কয়েক বছর পরে, উত্তর প্রদেশের প্রতাপগড় থেকে রাম নিরঞ্জন লাল শ্রীবাস্তব ও তাঁর পরিবার, দস্তানা পুতুলনাচের মতন একটি লোকশিল্পকে সম্বল করে বিনোদনের রসদ যোগানোর চেষ্টা করতেন। দস্তানা পুতুলনাচের বিনোদনের মোড়কে সামাজিক বার্তা প্রেরণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

রাম নিরঞ্জন, দুটি দস্তানা পুতুল চরিত্র তৈরি করেছিলেন – গুলাবো আর সিতাবো। তাঁর তৈরি প্রতিটা গল্পেই, এই দুই চরিত্রের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকত। রাম নিরঞ্জনের পুতুল নাচের মধ্যে দিয়ে কখনো উঠে আসত সমাজের কদর্য দিকগুলি যেমন, পণ প্রথা, মহিলা ও শিশু হত্যাকাণ্ড, বাল্য বিবাহের মতো ঘটনা, ঠিক তেমনি আবার নারী ক্ষমতায়ণ ও শিক্ষার প্রসারের মতন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বার্তাও উঠে আসত।

সম্প্রতি জুহি চতুর্বেদীর কলমে, সুজিত সরকারের পরিচালনায় আর অভীক মুখোপাধ্যায়ের শৈল্পিক ক্যামেরায় বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়া এই দস্তানা পুতুলনাচ যেন এক নতুন জীবন খুঁজে পেল, সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত গুলাবো সিতাবো ছবির মধ্যে দিয়ে।

ভগ্নপ্রায় প্রাসাদোপম ফাতেমা মহলের বাড়িওয়ালা সত্তরোর্ধ্ব মির্জা(অমিতাভ বচ্চন), “গুলাবো সিতাবো” ছবির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র, যিনি তাঁর চেয়ে ১৭ বছর বয়সের বড় বেগমকে বিয়ে করে শুধুমাত্র এই হাভেলির জন্য আর অপেক্ষা করে, কবে বেগম মরবে আর সে হবে ওই ফাতেমা মহলের মালিক।

ছবিতে দেখা যায় মির্জা তাঁর বাড়ির ভাড়াটিয়া বাঁকে( আয়ুষ্মান খুরানা অভিনীত) ও তার পরিবারকে নিয়ে যারপরনাই বিরক্ত, তিনি তাদের গলার কাঁটা মনে করেন। বারংবার বাড়ি ভাড়া চেয়ে কানাকড়িও আদায় করতে না পেরে, কখনও তাদের বাল্ব চুরি করেন, কখনও তাদের বিদ্যুতের লাইন কেটে দেন, মহলের অতিরিক্ত বাথরুমগুলিতে তালা লাগিয়ে দেন। ভাবটা এমন যেন, “তুমি চল ডালে ডালে, আমি চলি পাতায় পাতায়”! বাড়িওলা আর ভাড়াটিয়ার এই ইঁদুর বিড়ালের দ্বন্দ্ব চরমে গিয়ে পৌঁছায়, যখন বাঁকে সময় মতো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে না পেরে বিরক্ত হয়ে বাথরুমের দেওয়ালে লাথি মারে। বাঁকের ওই পায়ের আঘাতে বাথরুমের লজঝড়ে দেওয়াল ভেঙে যায়।

মির্জার বৈরিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু বাঁকে, যিনি ৩০ টাকারও কম ভাড়ায় তার মা ও বোনদের নিয়ে ফাতেমা মহলের একটি ঘরে ভাড়া থাকেন। তাদের এই দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় – বাথরুমের প্রাচীর ঠিক করা নিয়ে। এরই মাঝে ফাতেমা মহলকে কেন্দ্র করে নিজেদের অভিসন্ধি নিয়ে উড়ে এসে জুড়ে বসে এক দালাল আইনজীবী ক্রিস্টোফার (বৃজেন্দ্র কালা) । আর একজন সরকারী প্রত্নতাত্ত্বিক(বিজয় রাজ)। এই দুটি চরিত্রের অনবদ্য অভিনয় সুজিত সরকারের ছবিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে।

সুজিত সরকারের ফ্রেমের মাধ্যমে ফাতেমা মহলের লজঝড়ে দেওয়াল গুলিও যেন কখনও দারিদ্রতার কথা বলে, কখনও লোভের, কখনও হতাশার, কখনও নারী ক্ষমতায়ণের, কখনও ভয়ের, কখনও আবার আমাদের সাধারণ মধ্যবিত্ত মানসিকতার কথা বলে।

এই ছবির মহিলা চরিত্রগুলির সাহায্যে নারী ক্ষমতায়ণের কথা ফুটিয়ে তুলে ধরা হয়েছে, যারা সমাজের চিরাচরিত অবজ্ঞা বা বাঁকা চোখকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে গেছে। সে বাঁকের প্রেমিকাই হোক, বাঁকের বোন গুড্ডুই হোক বা ছবির শেষ মোচড়টি যিনি দেবেন সেই মির্জার বেগমই হোক। যদিও সেটা জানতে হলে দেখতে হবে গুলাবো সিতাবো।

ছবির শেষে মির্জার কপালে জুটলো শুধু এক জোড়া বেলুন, আর এই দৃশ্যই আমাদের সেই ছেলেবেলায় পড়া বহুল প্রচলিত “অতি লোভে তাঁতি নষ্ট” এর মত নীতিগল্পের কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়।

আপনারা এখনও যদি ছবিটি না দেখে থাকেন, তাহলে দেখে নেওয়ার অনুরোধ রইল।


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন