ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

সম্প্রতি ব্রিটিশ – ডাচ বহুজাতিক প্রসাধনী বিপণন সংস্থা ইউনিলিভার ও তার ভারতীয় অনুসারী সংস্থা হিন্দুস্থান ইউনিলিভার তাদের বহুল ব্যবহৃত ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’ – র মত ফেয়ারনেস ক্রিমের নাম বদল করতে চলেছে বলে জানিয়েছে। ইউনিলিভার চাইছে ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’ নাম থেকে ফেয়ার এর মত বর্ণবৈষম্যমূলক শব্দের পরিবর্তে কোনও বর্ণ – গন্ধহীন শব্দবন্ধ ব্যবহার করবে।

যারা একটা সময়, আত্মবিশ্বাস থেকে চাকরির সুযোগ –সবকিছুর ক্ষেত্রেই চামড়ার রং কেই মর্যাদা দিয়ে এসেছে,আজ তারাই পৃথিবী ব্যাপী ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের গুঁতোয় পড়ে, নতুন নামের সন্ধান করতে বাধ্য হচ্ছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।


১৯৬২ – র Civil Rights Movement এর এতগুলি বছর পরেও যখন আমেরিকার রাস্তায় শ্বেতাঙ্গ পুলিশের পায়ের চাপে দমবন্ধ হয়ে জর্জ ফ্লয়েডের মত কৃষাঙ্গ যুবক মারা যান, তখন পৃথিবী জুড়ে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও হ্যাশটাগের বন্যা বয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন জাগে, আদতে আমরা ভারতীয়রা বা আরও ভালোভাবে বলতে গেলে আমরা আন্দোলন প্রিয় বাঙালিরা আমাদের সৌন্দর্যের সংজ্ঞা কতটুকু বদলাতে পেরেছি ?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গল্পগুচ্ছের “সংস্কার” গল্পে কলিকা কে দিয়ে বলিয়েছেন,

“বৰ্ণভেদ তুমি মুখে অগ্রাহ্য কর অথচ কাজে তার প্রতিকারের জন্য কিছুই কর না। আমরা খদ্দর পরে সেই ভেদটার উপর অখণ্ড সাদা রঙ বিছিয়ে দিয়েছি, আবরণভেদ তুলে দিয়ে বর্ণভেদটার ছাল ছাড়িয়ে ফেলেছি।” 

সংস্কার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমরা, প্রতিনিয়ত আমাদের পারিপার্শ্বিক সমাজ ও সংস্কৃতিতে, “অন্ধকারে দাঁড়ালে দেখা যায় না”, বা “কালো কিন্তু ভালো” এই জাতীয় চামড়ার রং নিয়ে খোঁটা দেওয়ার মতো বাক্যবন্ধ হামেশাই শুনতে পাই। প্রতি শনিবার আর রবিবার খবরের কাগজের পাত্র পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে “উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ” এর মত শব্দবন্ধের ব্যবহার দেখতে পাই। ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ মানুষের মনেই এ বর্ণবাদী ধারণা গেঁথে আছে। অবচেতনেই ফর্সা আর সুন্দরকে গুলিয়ে ফেলি। আমাদের কাছে কারো গায়ের রঙ ফর্সা হওয়া মানে সে সুন্দর বা আকর্ষণীয়। আর কালো ত্বক মানে ‘ময়লা’ বা অসুন্দর। এর থেকেই পরোক্ষভাবে জন্ম নেয় মানসিক অবসাদ

এটি মূলত ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের প্রতিরূপ। সেই আর্যদের থেকে শুরু করে, দিল্লী সালতানাত, মুঘল, সবশেষে ব্রিটিশরা শাসন করেছে ভারত। এই সব জাতিই সাদা চামড়ার অধিকারী ছিল। 

এই ফর্সা রঙের প্রতি ভারতীয়দের “অবসেশন” এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে স্থানভেদে বিভিন্ন হিন্দু দেব দেবীর গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণের উল্লেখ থাকলেও তাঁদের সাদা রঙে সাজানো হয়। এর প্রধান উদাহরণ ভগবান শ্রী কৃষ্ণ, যাঁকে কোথাও কালো দেখানো হয় আবার কোথাও সাদা। আবার অন্যদিকে অসুর ও রাক্ষসদের হয় কালো নয় সবজে রঙে উপস্থাপন করা হয়।

এইভাবে “কালো” আর “ভালো” কে “কিন্তু” দিয়ে জুড়তে জুড়তে আমরা তাকে বিজ্ঞাপনের কপিতে পরিণত করে ফেলেছি, যা কিনা প্রকারান্তরে মধ্যবিত্তের মাসকাবারির ফর্দে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ক্রিমের সংখ্যা যোগ করল।

মজার বিষয় হচ্ছে ভারতের প্রথম বিউটি ক্রিম, আফগান স্নো ছিল এইসব কিছুর থেকে আলাদা। আফগান স্নো এর পুরানো বিজ্ঞাপনগুলিতে কোনও বর্ণবৈষম্যের ছোঁয়া ছিল না। তারা তাদের বিজ্ঞাপনে কখনও ফর্সা করে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়নি, তার পরিবর্তে তাদের ক্রিম আফগান স্নো কীভাবে ত্বককে ধুলো এবং দূষণ থেকে পরিষ্কার করে সেই কথাই বলেছে।

ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি
চিত্র সূত্রঃ The Print

এই জাতীয় ঔপনিবেশিক ধারণা আমাদের সমাজে বদ্ধমূল হয়ে থাকার নেপথ্যে অশিক্ষাও কিয়দংশে দায়ী। আমরা ছোটবেলায় কিন্তু এই বিষয়ে সকলেই জীবন বিজ্ঞান আর ভূগোলের পাতায় পড়েছি, কিন্তু পড়াটা আসলে ঐ নম্বরের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, তাকে প্রকৃতপক্ষে জানা আর হয়ে ওঠেনি।

আচ্ছা বেশ, আমি না হয় আপনাদের একটু ইস্কুল জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে এর কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করি।

দেখুন, আমাদের ত্বকে রয়েছে মেলানোসাইট নামের বিশেষ কোষ, যারা মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থ তৈরি করে। এই মেলানিনই ঠিক করে কার গায়ের রং কেমন হবে। মেলানিনের মাত্রা আবার নির্ভর করে জাতিসত্তা, বংশগতি, সূর্যালোকের উপস্থিতির ওপর। মেলানিন তৈরি বেড়ে গেলে ত্বকের রং গাঢ় বা কালো হয়ে যায়, যেমনটা ঘটে রোদে পুড়লে, আবার মেলানিন অস্বাভাবিক কমে গেলে রং ফ্যাকাশে সাদা হয়ে যাবে, যেমন শ্বেতী রোগে। এই মেলানিনকে প্রভাবিত করে দেহের কিছু হরমোনও।

ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি
চিত্র সূত্রঃ Skin Color Adaptation

দক্ষিণ এশীয় ও আফ্রিকার যেই দেশগুলি উষ্ণমণ্ডলে অবস্থিত অর্থাৎ  নিরক্ষরেখার উত্তরে ও দক্ষিণে উভয় দিকে 23½° অক্ষাংশ পর্যন্ত কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখাদ্বয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলের দেশগুলিতে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব সব চেয়ে বেশি হয়, একথা আমরা ছেলেবেলায় ভূগোলের বইতেই পড়েছি। এবার এই অঞ্চলের বসবাসকারীদের ত্বককে প্রাকৃতিক ভাবেই রোদের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচানোর জন্য মেলানোসাইট মেলানিন উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, ফলে ত্বক কালো হয়ে যায়। কিন্তু এসব জানা সত্বেও আমরা কালো কে ভালোর বিপরীতেই স্থান দিয়ে আসছি !


আরো পড়ুন – ডার্ক চকোলেট – তৃপ্তি ও অতৃপ্তির মেলবন্ধন


একদিকে যেমন এই অদ্ভুতুড়ে ধারণা আমাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত বর্ণবাদকে উস্কে দিচ্ছে। আর অন্যদিকে আমাদের এই কদর্য ধারণার উপর ভর করে গড়ে উঠছে কোটি কোটি টাকার ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি – র মত ফেয়ারনেস ক্রীমের ইন্ডাস্ট্রি।

ভারতের অন্যতম বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা নন্দিতা দাস ‘ডার্ক ইজ বিউটিফুল’ নামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেন যা সমগ্র ভারত জুড়ে যেমন আলোড়ন তোলে, তেমনি এর ফলাফলটাও ছিল খুবই আশাব্যঞ্জক, ২০১৩-১৪ সালে সারা ভারতে ফেয়ার এন্ড লাভলির বিক্রি ৪% কমে যায়, এইদিকে ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসামের বিক্রিও ১৪% কমে যায়।

সম্প্রতি ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয় থেকে অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন বন্ধে Drugs and Magic Remedies (Objectionable Advertisements) (Amendment) Bill, 2020 নামক নতুন বিল আনতে চলেছে। বিলটিতে  এমন অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন প্রচার কিংবা প্রকাশের জন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

আসুন আমরা ঔপনিবেশিক প্রভুদের নির্ধারণ করে যাওয়া সুন্দরের স্ট্যান্ডার্ড কে দূরে সরিয়ে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিকে মন থেকে ভালোবাসতে শিখি, কারণ এটি মেনে নিতে না পারলে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ওই ‘কালো কিন্তু ভালো’ র মতো বাক্যবন্ধনীর মধ্যেই আটকে পড়ে থাকবে আর বলিউড “কালে হ্যায় তো ক্যায় হুয়া দিলওয়ালে হ্যায়” এর মতো গান আমাদের উপহার দিয়ে যাবে, “মান” আর “হুঁশ” সমৃদ্ধ মানুষ আর হয়ে উঠতে পারবে না।


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন