ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

২৭/১১/২০১৯, ৩০/৫/২০১৯, ৪/৬/২০১৭, ১৬/১২/২০১৬…… ওহ দাঁড়ান দাঁড়ান আমার বোধহয় কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। এইটা শুধুমাত্র ক্যালেন্ডারের এই চারটে তারিখে আটকে নেই বরং পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতি ন্যানো সেকেন্ডেই এই পৃথিবীর কোনো না কোনো কোণে কোনো না কোনো শিশু থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলাকে কতগুলো কাপুরুষ রাক্ষসের হাতে ধর্ষিত হতে হচ্ছে ! ধর্ষণ এখন সমাজের রোজনামচা ! !

আমাদের সমাজে নারী কালি, নারী দূর্গা, আবার সেই নারীই ধর্ষিতা !


জানিনা এরকম আরও কত নির্ভয়া, কত প্রিয়াঙ্কাদের অকালে প্রাণ দিতে হবে ! জানিনা আর কতদিন “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে” কেঁদে চলবে !


নতুন করে আর কি বা বলব, এতক্ষনে আপনারা নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছেন যে গত বৃহস্পতিবার হায়দ্রাবাদের এক তরুণী পশুচিকিৎসকের দগ্ধ দেহ পাওয়া গিয়েছিল, যাঁকে ধর্ষণ করে পৌরুষত্বের ডঙ্কা বাজিয়ে তাঁকে আগুনে ঝলসিয়ে নিজেদের কামুক শরীরকে শান্ত করেছে, যা বনের পশুদেরও লজ্জায় ফেলে দেবে। সত্যি ধর্ষণ এখন সমাজের রোজনামচা !!

বাড়ি থেকে বুধবার সকালে কোল্লুরু গ্রামে পশু হাসপাতালে গিয়েছিলেন ওই তরুণী পশুচিকিৎসক। সন্ধ্যায় সেখান থেকে ফিরে টোল প্লাজার কাছে স্কুটি দাঁড় করিয়ে ক্যাব নিয়ে গোচিবাওলিতে এক চর্মচিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে যান তরুণী। রাত ন’টায় টোল প্লাজায় ফিরে দেখেন তাঁর স্কুটির টায়ার ফেটে গিয়েছে। তখন দুই ট্রাকচালক তাঁকে সাহায্যের আশ্বাস দেন।

আনন্দবাজার পত্রিকা

কিছুদিন আগে আপনারা দেখে থাকবেন উত্তরপ্রদেশের এক ধর্ষিতা কে বিচারের বদলে কোনো এক রাজনৈতিক “ন্যাতার” অঙ্গুলিহেলনে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর হুমকি এবং শেষে বলিউডি কায়দায় পথ দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে জীবনের সাথে লড়াই করতে হয়। ঠিক যেমন ২০১৫ তে পার্কস্ট্রিট ধর্ষণকে বাংলার অগ্নিকন্যা “সাজানো ঘটনা” বলে অভিহিত করেছিলেন।

হায়দ্রাবাদের এই ঘৃণ্য ঘটনার প্রতিবাদে সংসদ ভবনের সামনে প্রতিবাদ দেখালেন দিল্লির এক যুবতী। ‘আমার ভারতে আমি নিরাপদ নই কেন?’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ করছিলেন অনু দুবে। আর এর জেরেই তাঁকে গ্রেফতার করে দিল্লি পুলিশ। এইসব ঘটনাই, আমাদের ঘাড় ধরে বুঝিয়ে দেয়, ধর্ষণ এখন সমাজের রোজনামচা !!

আমাদের দেশে দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রীদের জেড প্লাস নিরাপত্তা দেওয়া হয় আর রাস্তায় ধর্ষিত হতে হয় নির্ভয়া, প্রিয়াঙ্কাদের, কখনো এই পাশবিক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে অচিরেই প্রাণ দিতে হয় বরুণ বিশ্বাসের মতন নির্ভীক শিক্ষকদের, কখনো আবার দেশের রাস্তাতেই ৪৮ জন জোয়ানকে উত্তর পশ্চিম প্রান্ত থেকে আসা ফিদাইন হামলাকারীদের হাতে মৃত্যুবরণ করতে হয় !

আর আমরা কিবোর্ড দাবিয়ে ফেসবুক আর টুইটারের দেয়াল ভরাট করি সাথে ফাউ হিসাবে মোমবাতি মিছিল করে সমবেদনা জানাই আর পরেরদিন সকালের প্রাতঃক্রিয়ার সাথে সব ভুলে ইঁদুর দৌড়ে একে অপরের কাঁধে কাঁধ মেলাই।

আসল কথা হল কত্তা, আমাদের মেকি সমাজে এই সাধারণ মানুষগুলোর জীবনের দাম নেই বললেই চলে !


আরো পড়ুন – পণ প্রথা ও আমাদের সমাজ ব্যবস্থা


যখন এই পাশবিক অত্যাচারের শিকার হতে হয় নির্ভয়া, টুইঙ্কল, প্রিয়াঙ্কাদের তখন এই আমাদেরই সমাজের এক শ্রেণীর “নীতি পুলিশ” মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে চায়ের সাথে ‘টা’ হিসাবে আতসকাঁচের তলায় রেখে সেই ধর্ষিতার চরিত্র বিশ্লেষণে বসে পড়েন। সেখানে সেই বিশেষ্যজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণে ফুটে ওঠে নারীর পোশাক, বাইরে বেরোনোর সময়(রাত), সূরা পান করা, মোবাইল ব্যবহার করা, চাউমিন খাওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা আমাদের ঘরের সুপূত্তুরদের মনে সুড়সুড়ি দিয়ে জানান দেয়, এখনই তো সময় মাঠে নামার !

সাইকোলজিস্ট মধুমিতা পান্ডের ধর্ষকদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণায় যা উঠে এসেছে, তা অনেকটা এরকম

“most convicted rapists presented themselves as nonrepentant and attempted to justify their crimes.” They told Pandey that the women they raped had no idea how to dress modestly, that their body language was inviting and that all men raped — they were just the ones who were caught.

IOWA PUBLIC RADIO

জানিনা আমরা আদেও সমাজবদ্ধ জীব হিসাবে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি নাকি ওই কলকাতার বাসের কন্ডাক্টরদের ভাষায় পিছন দিকে এগিয়ে চলেছি ! এ সত্যি এক বিস্ময় !


সম্প্রতি ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর Crime in India, 2017 রিপোর্টে যে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে তা সকল ভারতীয় নারীর ও তাঁর অভিভাবক এবং শুভাকাঙ্খীদের কপালে ভাঁজ ফেলে দেওয়ার পক্ষ্যে যেথষ্ট।

ধর্ষণ এখন সমাজের রোজনামচা !!
ছবির উৎস : The Hindu

এরমধ্যে

  • স্বামী বা তার আত্মীয়দের দ্বারা নিষ্ঠুরতা – ২৭.৯%
  • মহিলাদের প্রতি আক্রমণ ও শ্লীলতাহানী – ২১.৭%
  • মহিলাদের অপহরণ সংক্রান্ত – ২০.৫%
  • ধর্ষণ সংক্রান্ত – ৭.০%

এই সামাজিক ব্যাধি নিরাময় করার জন্য বিভিন্ন সময় দেশের আইন প্রণেতারা বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছেন যেমন –

  • The Immoral Traffic (Prevention) Act, 1956
  • The Indecent Representation of Women (Prohibition) Act, 1986
  • Protection of Women from Domestic Violence Act, 2005
  • Protection of Children from Sexual Offences (POCSO) Act, 2012
  • The Sexual Harassment of Women at Workplace (Prevention, Prohibition, and Redressal) Act (POSH Act), 2013
  • Section 354A IPC
  • Section 354C IPC
  • Section 354D IPC
  • Section 376 IPC

নির্ভয়া কাণ্ডের পর ২০১৩ সালে Justice Verma কমিটির সুপারিশে ভারতীয় দন্ডবিধি কে আরো কঠোর করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ধর্ষণ এখন সমাজের রোজনামচা !!
ছবির উৎস : The Hindu

আপনি এখন বলতেই পারেন যে এত আইন থাকা সত্বেও সমাজ থেকে এরকম ঘটনা কমানো যাচ্ছে না কেন ?

সহজভাবে বলতে গেলে কত্তা ঘণ্টা তৈরী আছে কিন্তু বেড়ালের গলায় সেই ঘণ্টা পড়ানোর জন্য কঠোর লোকের বড় অভাব। এবার ধরুন অনেক কষ্ট ষষ্ট করে কাঠখড় পুড়িয়ে ঘণ্টা যাওবা পড়ানো গেল, কিন্তু কত্তা জানেন কি ভারতীয় আইন ব্যবস্থার সমার্থক হল ওই দামিনী ছবির সংলাপ, “তারিখ পে তারিখ” !

“Justice delayed is justice denied”

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, যে ওই তড়িঘড়ি করে বিচারের বাণী শোনাতে গিয়ে যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে সাজা না পেতে হয়। কারণ আইনের ভাষায় “one is considered innocent until proven guilty.”

Let Hundred Guilty Be Acquitted But One Innocent Should Not Be Convicted

পারলে “টুইলভ অ্যাংরি মেন”বা তার হিন্দি সংস্করণ বাসু চ্যাটার্জির পরিচালনায় “এক রুকা হুয়া ফ্যাসলা” ছবিটি বা “ক্রিমিনাল জাস্টিস” বলে হিন্দি ওয়েব সিরিজটা দেখতে অনুরোধ করব।


এই লেখাকে আর অযথা বিলম্বিত না করে শুধু এটুকুই বলব যে পরিবারে অভিভাবকদের আরেকটু সচেতন হতে হবে, তাদের দায়িত্ব নিয়ে সন্তানদের উভয় লিঙ্গের প্রতি সন্মান করতে, ভালোবাসতে শেখাতে হবে, কারণ কোষ যেমন আমাদের শরীরের একটি ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ঠিক তেমনি পরিবারও এই বৃহত্তম সমাজের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ, একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ।


এই ঘৃণ্য সমাজের এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ হিসাবে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা মহিলাদের উপর এই অমানবিক নির্যাতনের জন্য আমি সত্যিই লজ্জিত !


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন