ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

চকোলেট খেতে আমরা কমবেশী সকলেই ভালোবাসি, এমনকি প্রতি বছর গোটা বিশ্ব জুড়ে সাড়ম্বরে উৎযাপিত হয়, “ওয়ার্ল্ড চকোলেট ডে”। আসুন আমরা ঘুরে আসি সেই অন্দরমহলে যেখানে ‘ডার্ক চকোলেট – তৃপ্তি ও অতৃপ্তির মেলবন্ধন’ এ আত্মপ্রকাশ করে। এখানে মালিকপক্ষের মুনাফা লাভের তৃপ্তি আর আমাদের মতো চকলেট প্রেমীদের রসনাতৃপ্তির পিছনে অব্যক্ত থেকে যায় আফ্রিকার ছোট ছোট শিশুদের শৈশবকে উপভোগ করতে না পারার অতৃপ্তি।


আচ্ছা ছাড়ুন ‘ডার্ক চকোলেট – তৃপ্তি ও অতৃপ্তির মেলবন্ধন’ নামক জটিল তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে আপনাদেরকে বরং একটু চকোলেট খাওয়াই, নানা যে সে চকোলেট নয়, এটা হল আইভরি কোস্ট, ঘানা থেকে উৎপাদিত কোকো থেকে বানানো চকোলেট।

পশ্চিম আফ্রিকার এই দুটো দেশে পৃথিবীর মোট কোকোর ৬৯% চাষ করা হয়। এই অঞ্চলের প্রায় ১৮ লক্ষ শিশু তাদের শৈশবকে রং বাহারি মোড়কে মুড়ে আমার মুখে, আপনার মুখে, আমাদের বাড়ীর সন্তানদের মুখে তুলে দিচ্ছে। এই সাব-সাহারান আফ্রিকার ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৩০% শতাংশ শিশুই এখানে শিশু শ্রমিক, যারা বেশিরভাগ কোকো চাষের সাথে যুক্ত।

ডার্ক চকোলেট - তৃপ্তি ও অতৃপ্তির মেলবন্ধন
চিত্র সূত্রঃ Wikimedia Commons

নেসলের মতো বিশ্বের বিখ্যাত সমস্ত চকোলেট কোম্পানিগুলো এখান থেকেই তাদের চকোলেটের জন্য কোকো কিনে থাকে।

২০১৩ – ১৪ সালের একটি পরিসংখ্যান বলছে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী ১৮ লক্ষ শিশুদের মধ্যে প্রায় ৮ লক্ষ শিশু এই ঝুঁকিপূর্ণ কোকো চাষের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন তাদের ওই ধারালো “মেছেটে ছুড়ি আর নানান রাসায়নিক ক্রিয়া বিক্রিয়ার সাথে শৈশব কাটাতে হয়। তার সাথে আছে ১০০ কেজির কোকো বীনের বস্তা কাঁধে নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।

২০১৬ সালে ফরচুন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট বলছে,

“For a decade and a half, the big chocolate makers have promised to end child labor in their industry—and have spent tens of millions of dollars in the effort. But as of the latest estimate, 2.1 million West African children still do the dangerous and physically taxing work of harvesting cocoa.”

bitter Sweets

প্রতিযোগিতার বাজারে কোকোর দাম কম রাখার জন্যই শিশু শ্রমিকের প্রয়োজন পরে, কারণ ৫-১১ বছর বয়সী শিশুদের কাজ করানোর জন্য মজুরি দিতে হয় না, কোকো ফিল্ডের দুর্গম পথে যেখানে বড়রা যেতে দ্বিধা বোধ করেন সেখানেই এই শিশুদের পাঠানো হয়। রাস্তায় সাপ, বিষাক্ত পোকা, বিছের কামড়ে অনেক সময়েই তাদের শরীরে প্রবাহিত রক্তের রং লাল থেকে পাল্টে নীল হয়ে যায়। এই শিশুরা কখনো ঋণ বন্দী হিসাবে, কখনো আশপাশের বুরকিনা ফাসো, টোগো, মালী ইত্যাদি দেশগুলি থেকে কিছু নোংরা হাত বদলিয়ে পাচার হয়ে পশ্চিম আফ্রিকার এই দুটি কোকো সমৃদ্ধ অঞ্চলে এসে পৌঁছায় কিন্তু এতে মালিকদের কিছুই যায় আসে না, দিনের শেষে তারা শুধু তাদের ফাইনাল অ্যাকাউন্ট খাতায় মুনাফাটাই দেখতে চায়।

কী হল ? হাঁ করে তাকিয়ে কি দেখছেন মোড়কটা ছিঁড়ে একটা কামড় তো দিন !


আরো পড়ুন – ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি: ফেয়ারনেস ক্রিমের নামের বদল কি আমাদের ধারণা বদলাতে পারবে?


যাইহোক, এবার আসুন আমরা ডার্ক চকোলেটের মোড়কটা আরেকটু যত্নসহকারে ছাড়িয়ে নিয়ে দেখি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন, শিশু শ্রম নিয়ে কি বলছে,

“Child labour is mentally, physically, socially or morally dangerous and harmful to children; and interferes with their schooling by depriving them of the opportunity to attend school; by obliging them to leave school prematurely; or by requiring them to attempt to combine school attendance with excessively long and heavy work.”

What is child labour

এই কোকো ফার্মের ৪০% শিশু শ্রমিক দুর্ভাগ্যক্রমে মেয়ে। মেয়েদের বয়ঃসন্ধি থেকে যৌবন আসে এই কোকো বাগানেই। এদের মধ্যে অধিকাংশ শিশুই আর তাদের দূরে ফেলে আসা পরিবারের মুখ টুকুও দেখতে পান না, কারণ এটাও সেই চক্রবূহর মতই, যেখানে ঢুকে গেলে আর বেরোনোর পথ খুঁজে পাওয়া যায়না, বরং অন্ধকারেই ক্রমশ তলিয়ে যেতে হয়।

মালিক থেকে পুলিশ সকলেরই প্রমোদ মেটায় ওই ছোট ছোট শিশুদের দেহ, যা ধীরে ধীরে ওই কোকো বাগানেই পচে গলে এই পৃথিবীর অজানা ওই কোণেই মিশে হারিয়ে যায়!


একবিংশ শতাব্দীতে এই নতুন মোড়কেই ক্রীতদাস প্রথা চলতে থাকে আর তা বিশ্বের তাবড় দেশগুলির এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার ক্রমাগত সমালোচনা আর চোখ রাঙানি কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েই চলতে থাকে !

সকল দেশের দাদা মানে আমাদের ওই মার্কিন মুলুকের কথা বলছি, তারা ২০০১ সালে অনেক হম্বি তম্বি করে হাউজ অফ্ রিপ্রেজেন্টেটিভে কোকো বা কোকোয়া চাষে শিশু দাস বৃত্তির অবসান ঘটানোর জন্য একটি সংশোধনী বিল প্রস্তাব করে। কিন্তু ও বাওয়া স্মিথ সাহেবের অদৃশ্য হাত চকোলেট কোম্পানির মালিক পক্ষের হয়ে এসে ওই বিল সেনেটে পৌঁছানোর আগেই ঘোড়া কেনা বেচার মাধ্যমে পাশা পাল্টে দেয়।

ব্যস আর কি, তখন চকোলেট কোম্পানির মালিকের সাথে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য দের মধ্যে হারকিন এঞ্জেল প্রটোকল নামে একটি নামকাওয়াস্তে চুক্তি হয়। চুক্তির কথা মাথায় রেখে ২০১২ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটা প্রস্তাব পাশ হয় কিন্তু সেই প্রস্তাবে কোনো আইনি বাঁধন না থাকার জন্য পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক অধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে সমালোচিত হয়।

সমস্ত চকোলেট তৈরির কোম্পানিগুলি ধীরে ধীরে এই ঘৃণ্য শিশু শ্রমের অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হয় কিন্তু আজও ওই কথা দেওয়া আর কথা রাখার মধ্যে ফাঁকটা থেকেই গিয়েছে !


আরে নানা, আমি আপনাদের ডার্ক চকোলেট খেতে মোটেই বারণ করছিনা, আমি শুধু এটুকুই বলছি যে, কি জানেন আমি, আপনি আসলে অনেএএএএএএএএএক ভালো আছি !


কি কেমন লাগল ডার্ক চকোলেট ? আরে আপনার ঠোঁটের কোণে লাল লাল কি যেন লেগে আছে, কি আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না ? মনে হচ্ছে মশকরা করছি ? ঠিক আছে আয়নায় গিয়ে একবার নিজের মুখটা দেখুন !


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন