খেরোর খাতা

চঞ্চু – সত্যজিৎ রায়কে সম্মান জানানোর এক মহৎ প্রচেষ্টা

ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

আজকের এই নেটফ্লিক্স, আম্যাজন প্রাইম, হইচই এর মতো বড় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের যুগে স্বল্প বাজেটেও যে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি বানানো যায় সেটা চঞ্চু না দেখলে হয়তো জানতামই না।

হ্যাঁ, আমি সত্যজিৎ রায়ের বৃহচ্চঞ্চু কাহিনী অবলম্বনে, আবির রায় পরিচালিত চঞ্চু ছবিটির কথাই বলছি। ড্রিম সিটি আর্টিস্ট প্রোডাকশনের এই ছবিটি বর্তমানে ইউটিউবে বিনামূল্যে দেখা যাচ্ছে। 

কোনোরকম বাড়াবাড়ি নেই, অতি নাটকীয়তা নেই, অহেতুক ম্যানারিজিম নেই, ছবির চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই সিনেম্যাটিক লিবার্টি ব্যবহৃত হয়েছে। 

চঞ্চু

সত্যি বলতে খুব সাম্প্রতিক অতীতে এরকম মেদহীন, নির্ভেজাল কল্প বিজ্ঞানের ছবি দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। তুলসিবাবু “ডবল উল্কাপাৎ” (গল্পে “ডবল রামধনু”) দেখে অবাক নাও হতে পারেন, কিন্তু মাইরি বলছি চঞ্চু আমাকে বেশ অবাক করেছে।


বাংলায় বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী যারা লিখেছেন, তাদের প্রসঙ্গ উঠলে সত্যজিৎ রায়ের কথা বিশেষ করে বলতে হয়। বর্তমান সময়ের যেসব বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলো আমরা পড়ি, সেসবে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আর জটিলতার আধিক্য থাকে, কিন্তু সত্যজিতের গল্পগুলো এক্ষেত্রে বড় ব্যতিক্রম। 

খানিকটা বিজ্ঞান, আর তার চাইতে একটু বেশি কল্পনা মিশিয়ে লেখা এই গল্পগুলোর চরিত্ররা অনেক সময়ই বড় বিজ্ঞানী কিংবা দুঃসাহসী অভিযানকারী না হয়ে হন আমাদের আশপাশের কেউ, আর হয়ত এই নৈকট্যই গল্পগুলোকে আমাদের কাছে সাধারণের চাইতে বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। বৃহচ্চঞ্চু তেমনই একটি কল্প কাহিনী। 

দণ্ডকারণ্যে কবিরাজি গাছ গাছড়া খুঁজতে গিয়ে তুলসিবাবু মাটিতে একটিবৃহৎ আকারের ডিম দেখতে পান। সেই ডিম ফেটে বেড়িয়ে আসে আজ থেকে আঠারো লক্ষ বছর আগে এই নীলগ্রহ থেকে হারিয়ে যাওয়া এক “সন্ত্রাসী পাখি”, যার বৈজ্ঞানিক নাম অ্যান্ডলগালোর্নিস

সেই ডিম ফেটে কুড়িয়ে পাওয়া একটি পাখির ছানার রহস্যময় পরিবর্তন নিয়েই বৃহৎচ্চঞ্চুর গল্প এগিয়ে চলেছে।


ছবির শুরুতেই পর্দায়  একটা লেখা ভেসে ওঠে, যা অনেকটা এরকম –

“এই ছবিটি সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রয়াসে সামর্থ্য অনুসারে নিজেদের ক্ষুদ্র আর্থিক অবদানে বানানো। এই ছবিটি থেকে কোনরকম আর্থিক উপার্জন করা আমাদের লক্ষ্য নয়। সেই কারণে youtube এও ভিডিওটি monetize করা হয়নি।

গল্পটির স্বত্ব তার আসল অধিকারীর কাছেই বর্তমান।”   

ড্রিম সিটি আর্টিস্ট প্রোডাকশন

গত ১৪ মার্চ ইউটিউবকেই প্ল্যাটফর্ম হিসাবে বেছে নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘চঞ্চু’। গল্পের কোনো স্বত্ব নেওয়া হয়নি তাই ছবির শুরুতে বারবার বলা হয়েছে এটি একটি আন-অফিসিয়াল স্বাধীনভাবে বানানো ছবি।

স্বত্বের কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই এই ছবি থেকে যে আয় করা যাবে না, তা জেনেও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে মাস কমিউনিকেশন এবং ভিডিওগ্রাফিতে স্নাতক পরিচালক আবির রায় এই ছবিটি বানিয়েছেন, বোধহয় একেই বলে শিল্পের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা !

‘বৃহচ্চঞ্চু’ -র মতো গল্পগুলি নিয়ে ছবি বানানো চাট্টিখানি কথা নয় তাও আবার স্বল্প বাজেটের মধ্যে। একথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে, ‘বৃহচ্চঞ্চু’ নিয়ে ছবি বানাতে গেলে ভালো বাজেট লাগবে। পরিচালনায় মুন্সিয়ানার পাশাপাশি চিত্রনাট্যও হতে হবে ঝকঝকে।

কম বাজেট নিয়ে ছবি বানাতে গেলে পরিচালক থেকে চিত্রনাট্যকারকে  অনেক হ্যাপা পোহাতে হয়, অনেক বিষয় ভেবে চিনতে পা বাড়াতে হয়। সোজা কথায় বলতে গেলে ওজন বুঝে চলতে হয়। 

এই ধরণের স্বল্প বাজেটের ছবির ক্ষেত্রে চিত্রনাট্যকারকে বাজেট অনুযায়ী চিত্রনাট্য লিখতে হয় আর সেইসাথে চিত্রনাট্য এমনভাবে সাজাতে হয়, যাতে বাজেটে চলে আসে। ‘চঞ্চু’ অনেকটা এরকম ভাবে বানানো একটা ছবি। পরিচালক খুব কায়দা করে বেশ কিছু খরচ বাঁচিয়েছেন। 

বাংলা ছবিতে ভিএফএক্স এর ব্যবহার এর আগেও হয়েছে, উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে “ইয়েতি” বা “বুনিপ” এর কথা, এই সিনেমাগুলোর বাজেটও অনেক বেশি ছিল, কিন্তু সেই অর্থে ওই ভিএফএক্স পাতে দেওয়ার মতন নয়।

তাই এত কম বাজেটে এত সুন্দর ভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে ভিএফএক্সের ব্যবহার দেখে চঞ্চু ছবির পরিচালক সহ গোটা ড্রিম সিটি আর্টিস্ট প্রোডাকশন টিমকে বাহবা না দিয়ে পারছি না। 

চঞ্চু- র সিনেম্যাটোগ্রাফি, সাবলীল গল্প বলার ধরণ আর অবশ্যই ভিএফএক্স হল এই ছবির ইউএসপি।


আরো পড়ুন – গুলাবো সিতাবো, লখনৌ এর বিরিয়ানির মতোই সুস্বাদু


যেহেতু ছবিটি সত্যজিত রায়কে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে বানানো তাই ইস্টার এগ হিসাবে পরিচালক ছবির মধ্যে খুব বুদ্ধি করে কিছু নিদর্শনও রেখেছেন, যেমন, গণেশের মূর্তি, লাইব্রেরি থেকে বই ইস্যু করার তারিখ ২রা মে, মানিক স্মৃতি আবাসন, খবরের কাগজের পাতায় গ্রীক জীবতত্ববিদ হেক্টর ডিমেট্রিয়াস নিখোঁজ, রাজরানী মন্দির থেকে যক্ষীর মাথা চুরির মত খবর, রিংটোন হিসাবে ব্যবহার হয়েছে মহারাজা তোমারে সেলাম। 

তবে চঞ্চুর সব ভালোর মধ্যেও কিছু খামতিও আছে যেমন এই ছবির এতো ভালো সিনেম্যাটোগ্রাফি, চিত্রনাট্য, ভিএফএক্স এর পাশে অভিনয়ের অসামঞ্জস্যতা কিন্তু চোখ এড়াবে না।

অভিনয়ে স্বাভাবিক ছন্দের অভাব রয়েছে, কিছু জায়গায় ডায়লগ থ্রো এর ক্ষেত্রে যথেষ্ট জড়তা চোখে পড়েছে। অভিনয় আরেকটু হয়তো ভালো হতে পারতো। 

এই খুচরো সামান্য কিছু ত্রুটি বাদ দিলে এই স্বতন্ত্র ছবি বাংলার যে কোনো বড় বাজেটের নাম করা ছবিকে সমানে সমানে টক্কর দিতে পারে।

তাই যদি ছবিটি এখনো না দেখা হয়ে থাকে আর অপেক্ষা না করে দেখে ফেলুন কারণ ছবিটি খুব বেশিদিন আর ইউটিউবে থাকবে বলে মনে হয় না।


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

Previous

২০২১ এর ভোটে “খেলা হবে” নাকি “বিকাশ হবে”?

Next

নিজেদের মতে, নিজেদের গান গেয়ে আমরা “এই দেশেতেই থাকবো”

2 Comments

  1. আজ দেখলাম. সত্যিই খুব ভালো লাগলো. এই লেখাটা শেয়ার করছি।

  2. কৌশানী ভট্টাচার্য

    সত্যিই এক কথায় অসাধারণ লেগেছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by WordPress & Theme by Anders Norén

error: চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা যদি না পড় ধরা !!