ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

“চিনতে না কি সোনার ছেলে

ক্ষুদিরাম কে চিনতে ?

রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে

মুক্ত বাতাস কিনতে ?” – আল মাহমুদ

ক্ষুদিরাম

বেশ চলুন আজ ইতিহাসে পাতিহাঁস বিভাগে আমরা ইতিহাস বইয়ের ধুলো ঝেড়ে, হলদে হয়ে যাওয়া পাতাগুলি উল্টোদিকে উল্টিয়ে বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে চলে যাই। আসুন এই পর্বে ভারত মায়ের বীর সন্তান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু কে নিয়ে আলোচনা করা যাক।

১৮৮৯ সালে মেদিনীপুরের হাবিবপুর গ্রামে, ভারত মায়ের এক নির্ভীক সন্তান, ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম হয়। অকালেই তাঁর মাতৃ ও পিতৃবিয়োগ ঘটলে পরে তাঁর দিদি অপরূপা তাঁকে নিজের কাছে রেখে তাঁর দেখা শোনা করেন।

ক্ষুদিরাম বসু পড়াশুনায় মেধাবী হলেও কিশোরোচিত দুরন্তপনা ও দুঃসাহসিক কার্যকলাপের প্রতি তাঁর প্রথম থেকেই ঝোঁক ছিল। ১৯০৫ সালে যখন ভারতবর্ষ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনে জেগে উঠেছিল তখন তা ক্ষুদিরাম বসুর মতন কিশোরকেও প্রভাবিত করে আর তাই পরবর্তীকালে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে অনুশীলন সমিতি নামক একটি গুপ্ত সমিতিতে যোগদান করেন এবং কলকাতায় বারীন্দ্র কুমার ঘোষের কর্মতৎপরতার সংস্পর্শে আসেন। যখন ১৫ বছর বয়স তখন তিনি অনুশীলন সমিতির একজন একনিষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবী হয়ে ওঠেন এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নির্দেশে ভারতে ব্রিটিশ শাসন বিরোধী ‘সোনার বাংলা’ শীর্ষক বিপ্লবাত্মক পুস্তিকা বিতরণ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন।

এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে যায় আর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের প্রয়োজনভিত্তিক কঠোর পৈশাচিক সাজা ও দমননীতির কারণে কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড বাঙালিদের অত্যন্ত ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন।

বিপ্লবী কার্যকলাপকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ১৯০৭সালে, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ তাঁর সহযোগী হেমচন্দ্র কানুনগোকে প্যারিসে পাঠান, সেখানে নির্বাসনে থাকা রাশিয়ান বিপ্লবী নিকোলাস সাফ্রানস্কির কাছ থেকে বোমা তৈরির কৌশল শিখতে। পরবর্তীকালে যখন হেমচন্দ্র কানুনগো বাংলায় ফিরে আসেন তখন তিনি এবং বারেন্দ্র কুমার ঘোষ, দুইজনে মিলে তৎকালীন কলকাতা প্রেসিডেন্সির ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ডকে হত্যা করবে বলে ঠিক করেন।

এমন সময় আগুনে ঘি দেওয়ার মতো যখন তৎকালীন আলিপুর প্রেসিডেন্সি কোর্টের চিফ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড, “যুগান্তর” পত্রিকার ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত সহ অন্যান্য সম্পাদকদের কঠোর সাজা শুনিয়েছিলেন তখন এর প্রতিবাদ করে “যুগান্তর” আবার কড়া ভাষায় দ্বন্দ্বমূলক সম্পাদকীয় লিখে তাদের প্রতিক্রয়া জানায় এবং এর ফলস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার একে একে অন্য সম্পাদকদেরও গ্রেফতার করে । এইসব নানাবিধ কারণের জন্য সংবাদপত্রের প্রচার বৃদ্ধি পায় এবং ধীরে ধীরে “যুগান্তর” পত্রিকা অনুশীলন সমিতির জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আদর্শ প্রচারের সহায়ক হয়ে ওঠে। এইসময়, বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ একটা আদর্শ হিসেবে, প্রত্যক্ষ না-হলেও পরোক্ষভাবে বাংলার জনগণের সমর্থন আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

অনুশীলন সমিতির সহায়তায়, যুগান্তর এইসময় একটি গুপ্ত সমিতি হয়ে ওঠে। তারা কিংসফোর্ডকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং হেমচন্দ্র কানুনগোর তৈরি বই বোমা দিয়েই কিংসফোর্ডকে হত্যার প্রথম চেষ্টা হয়। কিন্তু তাদের এই প্রচেষ্টা বিফলে যায়। এরপর ১৯০৮ সালের মার্চ মাসে নিরাপত্তাজনিত ভয়ে পেয়ে, ব্রিটিশ সরকার কিংসফোর্ডের পদোন্নতি করে তাঁকে বিহারের মজফ্ফরপুর জেলার বিচারপতি হিসেবে বদলি করে দেয়।

এমতাবস্থায় দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় কিংসফোর্ডকে হত্যার দায়িত্ব বর্তায় বাংলার দুই নির্ভীক তরুণ, প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বোস এর উপর। তাঁরা সেই কথামত মজফ্ফরপুর পৌঁছে প্রথমে টানা তিন সপ্তাহ ছদ্মবেশে থেকে কিংসফোর্ডের গতিবিধির উপর নজর রাখতে শুরু করে।

৩০শে এপ্রিল, ১৯০৮, সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে উপস্থিত হল। দুই বঙ্গ সন্তান, মুজাফ্ফরপুরে ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে কিংসফোর্ডের গাড়ি ভেবে বোমা ছুড়ে হত্যা করতে গিয়েছিলেন অত্যাচারী ব্রিটিশ বিচারক ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড সাহেবকে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত যে গাড়িটিতে তাঁরা বোমা ছুড়েছিলেন তাতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। ছিলেন তাঁর সহকর্মী কেনেডির স্ত্রী ও মেয়ে। ফলে কিংসফোরর্ডের বদলে দুই ইংরেজ মহিলার মৃত্যু হয়।

এইঘটনার পর প্রফুল্ল চাকি আত্মহত্যা করলেও ক্ষুদিরাম বসু সেই সময়ের বিহারের সমস্তিপুর জেলার, ওয়াইনি ষ্টেশনে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন ফতে সিং এবং শিউ প্রসাদ সিং নামে ব্রিটিশ পুলিশের দুই কনস্টেবলের হাতে, পরে এই ওয়াইনি ষ্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ক্ষুদিরাম বোস পুসা রেলওয়ে ষ্টেশন রাখা হয়।

১লা মে, ১৯০৮, যখন ক্ষুদিরামকে মুজফফরপুর থেকে কলকাতা আনা হল তখন গোটা শহর যেন সেই রেল ষ্টেশনে ভিড় করেছিল এই অকুতোভয় কিশোরটিকে একবার চোখের দেখা দেখবে বলে। পরেরদিন ২রা মে তাই ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান লিখল –

The Railway station was crowded to see the boy. A mere boy of 18 or 19 years old, who looked quite determined. He came out of a first-class compartment and walked all the way to the phaeton, kept for him outside, like a cheerful boy who knows no anxiety…..on taking his seat the boy lustily cried ‘Vandemataram’.

Bihar Through the ages

এইসময়ে বালগঙ্গাধর তিলকও তাঁর সংবাদপত্র “কেশরী” তে দুজন নবীন বাঙালি যুবককে সমর্থন করে আওয়াজ তোলেন যার কারণে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার দেশদ্রোহিতার অপরাধে তিলককে গ্রেপ্তার করে।

শেষে দুইজন মহিলাকে হত্যা করার দায়ে তাঁর বিচার হয় এবং বিচারে ব্রিটিশ বিচারক মি. কর্নডফ তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেন।

এই রায় ঘোষণার পর ক্ষুদিরামের মুখে ছিল হাসি। অল্প বয়সী ক্ষুদিরামকে বিচারক কর্নডফ একপ্রকার প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, “ফাঁসিতে যে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে তো ?” ক্ষুদিরাম তখন মুচকি হাসলে পরে বিচারক আবার প্রশ্নটি করেন। বীর নির্ভীক ক্ষুদিরাম তত্‍ক্ষণাত্‍ বলেন, “আমাকে একটু সময় দিলে আমি সারা ভারতবাসীকে শিখিয়ে দিতাম কি করে বোমা বানাতে হয়।”

ফাঁসির আগেরদিন মানে ১০ আগস্ট যখন আইনজীবী সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী ক্ষুদিরামের সাথে জেলে দেখা করতে যান, তখন ক্ষুদিরাম তাঁকে বলেছিলেন –

‘রাজপুত নারীরা যেমন নির্ভয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়া জওহরব্রত পালন করিত, আমিও তেমন নির্ভয়ে দেশের জন্য প্রাণ দিব। আগামীকাল আমি ফাঁসির আগে চতুর্ভুজার প্রসাদ খাইয়া বধ্যভূমিতে যাইতে চাই।’

এইসময় যখন গোটা দেশ ভারতমাতার এই বীর সন্তানের জন্য চোখের কোণায় জল নিয়ে প্রার্থনা করছে তখন ক্ষুদিরাম বসুর সম্মানে লোককবি মুকুন্দ দাস একটি গান রচনা করলেন –

একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।
হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।

কলের বোমা তৈরি করে
দাঁড়িয়ে ছিলেম রাস্তার ধারে মাগো,
বড়লাটকে মারতে গিয়ে
মারলাম আরেক ইংলন্ডবাসী।

হাতে যদি থাকতো ছোরা
তোর ক্ষুদি কি পড়তো ধরা মাগো
রক্ত-মাংসে এক করিতাম
দেখতো জগতবাসী

শনিবার বেলা দশটার পরে
জজকোর্টেতে লোক না ধরে মাগো
হল অভিরামের দ্বীপ চালান মা ক্ষুদিরামের ফাঁসি

বারো লক্ষ তেত্রিশ কোটি
রইলো মা তোর বেটা বেটি মাগো
তাদের নিয়ে ঘর করিস মা
বৌদের করিস দাসী

দশ মাস দশদিন পরে
জন্ম নেব মাসির ঘরে মাগো
তখন যদি না চিনতে পারিস
দেখবি গলায় ফাঁসি ।

১১ই আগস্ট,১৯০৮ সালে তাঁর ফাঁসি হয়। ফাঁসির সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর, ৭ মাস ১১ দিন।


আরো পড়ুন – কলকাতার কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব এবং বাংলার প্রবাদ প্রবচন ও ছড়া


অবাক লাগে আমাদের যুবসমাজকে দেখে যারা কত সহজে চায়ের দোকানে বা রকে বসে সুখটান দিতে দিতে নিম্নস্তরের রসিকতা করে বলে, “আর যাই বল মামা, বার খেয়ে ক্ষুদিরাম হতে বল না”

সত্যি, একমাত্র বাঙালিরাই পারে ক্ষুদিরামের মতন নির্ভীক যোদ্ধার এই আত্মবলিদানকে নিয়ে নিম্নস্তরের রসিকতা করতে !! এই সমস্ত বাঙালির জন্য আমার করুণা হয় !

এইপ্রসঙ্গে অনেকদিন আগে পড়া একটা ছোট্ট গল্পের কথা বলি। ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির সময় দুজন বাঙালি উপস্থিত ছিলেন। একজন হলেন “বেঙ্গলি” পত্রিকার সংবাদদাতা ও উকিল উপেন্দ্রনাথ সেন আর অন্যজন হলেন ক্ষেত্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে উপেন্দ্রনাথ সেন, ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি নিয়ে একটা লেখা লেখেন, সেই লেখাটারই ছোট্ট একটা অংশ আপনাদেরকে বলব, ও হ্যাঁ এই নিম্নোক্ত অংশটা বিশেষ করে যুবসমাজের সেইসব গুণধর প্রতিনিধির জন্যেও যারা খুব সহজে এই বীরের আত্মবলিদানকে ছোট করে তাদের নিম্নস্তরের রসিকতা করার স্পর্ধা দেখায় –

“………………………১১ আগস্ট ফাঁসির দিন ধার্য হইল।
আমরা দরখাস্ত দিলাম যে ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিব। উডম্যান সাহেব আদেশ দিলেন দুইজন মাত্র বাঙালি ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিতে পারিবে। আর শব বহনের জন্য ১২ জন এবং শবের অনুগমনের জন্য ১২ জন থাকিতে পারিবে। ইহারা কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়া শ্মশানে যাইবে। ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিবার জন্য আমি ও ক্ষেত্রনাথ বন্দোপাধ্যায় উকিলের অনুমতি পাইলাম। আমি তখন বেঙ্গলি কাগজের স্থানীয় সংবাদদাতা। ভোর ছ’টায় ফাঁসি হইবে। পাঁচটার সময় আমি গাড়ির মাথায় খাটিয়াখানি ও সৎকারের অত্যাবশ্যকীয় বস্ত্রাদি লইয়া জেলের ফটকে উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম, নিকটবর্তী রাস্তা লোকারণ্য। সহজেই আমরা জেলের ভিতরে প্রবেশ করিলাম। ঢুকিতেই একজন পুলিশ কর্মচারী প্রশ্ন করিলেন, বেঙ্গলি কাগজের সংবাদদাতা কে? আমি উত্তর দিলে হাসিয়া বলিল, আচ্ছা ভিতরে যান। দ্বিতীয় লোহার দ্বার উন্মুক্ত হইলে আমরা জেলের আঙ্গিনায় প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম ডানদিকে একটু দূরে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে ফাঁসির মঞ্চ। দুই দিকে দুই খুঁটি আর একটি মোটা লোহার রড যা আড়াআড়িভাবে যুক্ত তারই মধ্যখানে বাঁধা মোটা একগাছি দড়ি ঝুলিয়া আছে। তাহার শেষ প্রান্তে একটি ফাঁস।

একটু অগ্রসর হইতে দেখিলাম ক্ষুদিরামকে লইয়া আসিতেছে চারজন পুলিশ। কথাটা ঠিক বলা হইল না। ক্ষুদিরামই আগে আগে অগ্রসর হইয়া যেন সিপাহীদের টানিয়া আনিতেছে। আমাদের দেখিয়া একটু হাসিল। স্নান সমাপন করিয়া আসিয়াছিল। মঞ্চে উপস্থিত হইলে তাহার হাত দুইখানি পিছন দিকে আনিয়া রজ্জুবদ্ধ করা হল। একটি সবুজ রঙের টুপি দিয়া তাহার গ্রীবামূল পর্যন্ত ঢাকিয়া দিয়া ফাঁসি লাগাইয়া দেওয়া হইল। ক্ষুদিরাম সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। এদিক ওদিক একটুও নড়িল না। উডম্যান সাহেব ঘড়ি দেখিয়া একটি রুমাল উড়াইয়া দিলেন। একটি প্রহরী মঞ্চের একপ্রান্তে অবস্থিত একটি হ্যান্ডেল টানিয়া দিল। ক্ষুদিরাম নিচে অদৃশ্য হইয়া গেল।
কেবল কয়েক সেকেন্ড ধরিয়া উপরের দিকের দড়িটা একটু নড়িতে লাগিল। তারপর সব স্থির।

কর্তৃপক্ষের আদেশে আমরা নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়া শ্মশানে চলিতে লাগিলাম। রাস্তার দুপাশে কিছু দূর অন্তর পুলিশ প্রহরী দাঁড়াইয়া আছে। তাহাদের পশ্চাতে শহরের অগণিত লোক ভিড় করিয়া আছে। অনেকে শবের উপর ফুল দিয়া গেল। শ্মশানেও অনেক ফুল আসিতে লাগিল।

চিতারোহণের আগে স্নান করাইতে মৃতদেহ বসাইতে গিয়া দেখি মস্তকটি মেরুদণ্ড চ্যুত হইয়া বুকের উপর ঝুলিয়া পড়িয়াছে। দুঃখে–বেদনায়–ক্রোধে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাথাটি ধরিয়া রাখিলাম। বন্ধুগণ স্নান শেষ করাইলেন তারপর চিতায় শোয়ানো হইলে রাশিকৃত ফুল দিয়া মৃতদেহ সম্পূর্ণ ঢাকিয়া দেওয়া হইল। কেবল উহার হাস্যজ্বল মুখখানা অনাবৃত রহিল।

দেহটি ভস্মিভূত হইতে বেশি সময় লাগিল না। চিতার আগুন নিভাইতে গিয়া প্রথম কলসি ভরা জল ঢালিতেই তপ্ত ভস্মরাশির খানিকটা আমার বক্ষস্থলে আসিয়া পড়িল। তাহার জন্য জ্বালা যন্ত্রণা বোধ করিবার মতন মনের অবস্থা তখন ছিল না। আমরা শ্মশান বন্ধুগণ স্নান করিতে নদীতে নামিয়া গেলে পুলিশ প্রহরীগণ চলিয়া গেল। আর আমরা সমস্বরে ‘‌বন্দেমাতরম’‌ বলিয়া মনের ভার খানিকটা লঘু করিয়া যে যাহার বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম। সঙ্গে লইয়া আসিলাম একটি টিনের কৌটায় কিছুটা চিতাভস্ম, কালিদাসবাবুর জন্য। ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলায় সে পবিত্র ভস্মাধার কোথায় হারাইয়া গিয়াছে ।”

Khudiram Bose

ওই বয়সে দেশের জন্য হাসতে হাসতে ফাঁসির কাঠে নিজের আত্মবলিদান দেওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারবেনা আজকের যুবসমাজ। ক্ষুদিরাম সত্যিই সকলে হতে পারবেনা। ওই জিনিষ হতে গেলে বুকের পাটা লাগে। আজকের যুবসমাজকে আমার বিনীত অনুরোধ তোমরা হচ্ছ নতুন প্রজন্ম, আগামীদিনে তোমাদেরই শক্ত হাতে ভারতের অগ্রগতি হবে। তাই এরপর কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কেউ এগিয়ে গেলে তাকে অবশ্যই সাবধান কর, কিন্তু দোহাই তাকে “বার খেয়ে ক্ষুদিরাম হচ্ছিস/হতে যাস না” এই জাতীয় কথা বলে সেই সমস্ত বীরদের আর সেইসাথে নিজেকে ছোট কর না, জান তো, চিৎ হয়ে থুতু ফেললে সেই থুতুটা নিজের গায়ে এসেই পরে। ভুলে যেও না, যে এই মানুষগুলোর আত্মবলিদানের জন্যই আজ তুমি, আমি, এইদেশের প্রতিটা মানুষ স্বাধীন মাটিতে দাঁড়িয়ে, এই বিসৃত আকাশের নীচে, মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিতে পারছি।

হে বীর শহীদ, তোমার এই আত্মবলিদান যে ভারতবাসী ভুলে গিয়েছে তুমি তাদের ক্ষমা করে দিও !!


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন