ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করতে গিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরো একবার পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চাশ – ষাটের দশকের বিধান পরিষদ প্রবর্তন করার প্রতিশ্রুতি দেন। যদিও এটা নতুন কিছু নয়, ২০১১ ভোটের সময়ও তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকায় বিধান পরিষদ ছিল।

বিধান পরিষদ
চিত্র সূত্রঃ উইকিমিডিয়া কমন্স

বয়সজনিত কারণে এবার ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে একাধিক বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাননি। এমনই বয়স্কদের বিধান পরিষদে ঠাঁই দেওয়া হবে। সহজ সরল ভাবে বলতে গেলে এবারের বিধানসভা ভোটে যাঁরা তৃণমূলের টিকিট পেলেন না, আগামিদিনে রাজ্যে বিধান পরিষদ গড়ে তাঁদের ‘পুনর্বাসন’ দেওয়া হবে।

এখন প্রশ্ন হল এই বিধান পরিষদ আসলে কী ? খায় না মাথায় দেয় ? এই বিধান পরিষদ গঠনের ভালো ও খারাপ দিকগুলোই বা কী ?

তাহলে আর ইনিয়ে বিনিয়ে ভূমিকা না করে চলুন আসল প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে নেওয়া যাক।


বিধান পরিষদ কী?

বিধান পরিষদ যাকে ইংরেজিতে Legislative Council বলা হয় সেটি আসলে ভারতে রাজ্য আইনসভার একটি অঙ্গ। 

ভারতীয় সংবিধানের ১৬৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী প্রতিটি রাজ্যে আইনসভা থাকার কথা বলা আছে। এই আইনসভা রাজ্যপাল সহ এক কক্ষ বা দ্বি কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা হতে পারে। দ্বি – কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা থাকলে উচ্চকক্ষ বিধান পরিষদ এবং নিম্নকক্ষ বিধানসভা নাম পরিচিত।

ভারতীয় সংবিধানের ১৭১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, বিধান পরিষদের সদস্য সংখ্যা সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভার সদস্য সংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশি হবে না। আবার কোনো অবস্থাতেই তা ৪০ এর কমও হবে না।

বিধান পরিষদ আসলে দ্বিকক্ষীয় রাজ্য আইনসভার উচ্চকক্ষ হিসেবে কাজ করে। এই কক্ষের সদস্যরা কেন্দ্রীয় রাজ্যসভার সদস্যদের মতোই পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। এটি একটি স্থায়ী কক্ষ, কারণ এই কক্ষ অবলুপ্ত করা যায় না।

বিধান পরিষদের সদস্যরা ছয় বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হন। প্রতি দুই বছর অন্তর বিধান পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য অবসর নেন।

বিধান পরিষদ

এইমুহুর্তে ভারতের ছ’টি রাজ্যে যেমন, উত্তর প্রদেশ, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা তে বিধান পরিষদ রয়েছে। এমনকি গত বছর নবীন পট্টনায়েকের ওডিশা তেও বিধান পরিষদ গঠন সংক্রান্ত একটি বিল পাশ হয়েছে। তবে এখানে উল্লেখ্য সব রাজ্যে বিধান পরিষদ এক প্রকারের নয়। 


বিধান পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা

  • ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। 
  • ন্যূনতম ৩০ বছর বয়স্ক হতে হবে। 
  • সংসদ নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। 
  • সরকারের কোনো লাভজনক পদে থাকতে পারবেন না। 
  • আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ও বিকৃত মস্তিষ্কের ঘোষিত হওয়া চলবে না। 

বিধান পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া

  • এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন পৌরসংস্থা, পুরসভা ও জেলা পরিষদের মতো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলি থেকে।
  • এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন বিধানসভার সদস্যদের ভোটে বিধানসভার সদস্য নন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে।
  • এক-দ্বাদশ অংশ সদস্য নির্বাচিত হন একটানা তিন বছর রাজ্যে বসবাসকারী স্নাতকদের মধ্যে থেকে।
  • এক-দ্বাদশাংশ সদস্য নির্বাচিত হন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যূন মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অন্তত তিন বছর শিক্ষকতাকারী ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে।
  • এক-ষষ্ঠাংশ সদস্য মনোনীত হন রাজ্যপাল কর্তৃক সাহিত্য, বিজ্ঞান, কলা, সমবায় আন্দোলন ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানকারীদের মধ্যে থেকে।

বিধান পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলী 

সেইভাবে দেখতে গেলে বিধান পরিষদের সেরকম কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা না থাকলেও কিছু উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা গুলি হল –

  • বিধান পরিষদের আইনি ক্ষমতা – অর্থবিল ছাড়া যে কোন বিল বিধান পরিষদে উত্থাপন করা যায়। বিধানসভায় পাশ হওয়া কোনো বিলকে বিধান পরিষদ সর্বাধিক ৪ মাস পর্যন্ত আটকে রাখতে পারে।
  • বিধান পরিষদের আর্থিক ক্ষমতা – অর্থ বিল বিধান পরিষদে উত্থাপন করা যায় না। বিধান পরিষদের অর্থ সংক্রান্ত ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে।
  • বিধান পরিষদের শাসন ক্ষমতা – সংবিধান অনুসারে রাজ্যের মন্ত্রীসভা শুধুমাত্র নিম্নকক্ষ বিধানসভার কাছেই দায়বদ্ধ। ফলে শাসন সংক্রান্তও তেমন ক্ষমতা নেই বিধান পরিষদের।

রাজ্যে বিধান পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া

রাজ্যে বিধান পরিষদের গঠন করতে গেলে সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে হবে। সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভার পাশাপাশি সংসদের দুই কক্ষেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিল পাশ করানো প্রয়োজন।


আরো পড়ুন – ভারতীয় সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা


পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে বিধান পরিষদ

পশ্চিমবঙ্গেও একটা সময় বিধান পরিষদ ছিল। ১৯৬৯ সালে যুক্তফ্রণ্টের সরকার ক্ষমতায় এসে প্রায় ছয় দশক আগে তার অবলুপ্তি ঘটায়।

১৯৬৯ সালের নির্বাচনে যেহেতু যুক্তফ্রন্টের ৩২ দফা কর্মসূচিতে বিধান পরিষদ বিলোপের প্রতিশ্রুতি ছিল সেহেতু মন্ত্রিসভার বৈঠকে তা তোলা হলে তেমন আপত্তি ওঠে না এবং তা পাশ করিয়ে নেওয়া হয়।

২০১১ সালে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস সরকার পুনরায় এই পরিষদ গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত করা হয়নি।

বিধান পরিষদের সুবিধা

  • প্রথমত, রাজ্য আইনসভার উচ্চকক্ষে যেহেতু সমাজের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবিদের একটা অংশ প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। তাই রাজ্যের দ্বি কক্ষিয় আইনসভার মাধ্যমে যেই আইন পাশ হবে তা অনেক পরিশীলিত ও বিচক্ষণতার সাথেই পাশ হবে এমনটা ধরে নেওয়া যেতে পারে।
  • দ্বিতীয় কক্ষের যাঁরা সমর্থন করেন তাঁদের অনেকের মত অনুযায়ী, আইনসভার উচ্চ কক্ষ জনগণের হিতেই নিম্ন কক্ষের অনৈতিক ও অবিবেচিত আইন তাড়াহুড়ো করে পাশ করানোর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করার সুযোগ পেয়ে থাকে।
  • উচ্চকক্ষ, সুস্থ ও স্বাভাবিক গণতন্ত্রকে রক্ষার স্বার্থে, নিম্ন কক্ষের স্বৈরাচারী মনোভাব কে রুখে দেওয়ার বা বিরোধিতা করার সম্ভাবনা থাকে।

বিধান পরিষদের অসুবিধা

  • সরকারের কোষাগারের উপর অহেতুক বোঝা বাড়ানো।
  • রাজ্যে যেহেতু এই কক্ষের বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই তাই সেক্ষেত্রে রাজ্যে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তাও প্রশ্নের সামনে পড়ে যায়।
  • অনেক ক্ষেত্রে মনে করা হয়, আইনসভার উচ্চকক্ষ রাজনৈতিক কারণের জন্য কোনো না কোনো কাজের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
  • অনেকসময়ই দেখা যায় সাধারণ নির্বাচনে জনগণের ভোটে জিতে নিম্নকক্ষে প্রতিনিধি হয়ে প্রবেশ না করতে পারলে, উচ্চকক্ষের পিছনের দরজা দিয়ে আইনসভার ভিতরে প্রবেশ করে।

দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ

উপরোক্ত বিষয় দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন তাঁদের ২০০৫ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে কিছু সুপারিশ করেন যেমন –

  • শিক্ষক ও গ্রাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের আসন সংখ্যা কমানো বা অবলুপ্ত করা উচিত।
  • পঞ্চায়েত ও কর্পোরেশনের  ক্ষমতা বৃদ্ধি করা উচিত।
  • জাতীয় স্তরে রাজ্যসভায় যেমন রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ থাকে, ঠিক তেমনই বিধান পরিষদেও পঞ্চায়েত ও কর্পোরেশনের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়া উচিত। এর ফলে তৃণমূলস্তরের গণতন্ত্র অনেক শক্তিশালী হবে।

বর্তমান সময়ে যদি রাজ্যে দ্বি কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার প্রবর্তন করা হয় তাহলে তা যেন শুধুমাত্র পুনর্বাসন প্রকল্প হিসাবে বা দলের লোকদের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য না হয়। বিধান পরিষদ যদি একান্তই গঠন করা হয় তা যেন আক্ষরিক অর্থেই তৃণমূল স্তরের প্রতিনিধি কে গণতন্ত্রের বৃহত্তর মঞ্চে তাঁদের স্থানীয় সমস্যা, অভিযোগ, অনুযোগ, দাবী দাওয়া, সুপারিশ, ইত্যাদি করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ পায় সেটা নিশ্চিত করা একান্ত কাম্য।


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন