ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

সম্প্রতি ভারতে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়ালো, কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই ঊর্ধ্বমুখী লেখচিত্র কে সমান করার কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ সেভাবে মেলেনি, যা স্বভাবতই সাধারণ মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করেছে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল বাড়াতে থালা বাজানো থেকে ফুল ছড়ানো সবই হল, হল না শুধু স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নতি !

এই মুহুর্তে করোনা পরিবারের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভাইরাসের উপদ্রবে নাজেহাল গোটা পৃথিবী। সেইসাথে প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা। গণিতের ভাষায় এর আবার একখানা গালভরা নাম আছে, জিওমেট্রিক প্রোগ্রেশন।

গতকাল কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়ালো। পরিস্থিতি এমন দিকে এগোচ্ছে, যে এখন প্রতি তিন দিনে এক লক্ষ করে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

ভারতে করোনা
Photo by Siora Photography on Unsplash

কেন্দ্রীয় হিসাব বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতে করোনা সংক্রমিত হয়েছেন ৩৪,৯৫৬ জন এবং মারা গিয়েছেন ৬৮৭ জন। মোট মৃতের সংখ্যাও ২৫ হাজার ছাড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা আরও সঙ্গীন।


ভারতে করোনা সংক্রমণ রুখতে গত ২৫ শে মার্চ থেকে দেশজুড়ে যে লকডাউন লাগু করা হয়েছিল তার একটা নির্দিষ্ট কারণ ছিল। লকডাউন করার মূল উদ্দেশ্যটাই হল সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের থেকে করোনায় আক্রান্ত রুগীদেরকে চিহ্নিত করে তাদের আলাদা করা, যাতে খুব দ্রুত আবার স্বাভাবিক ছন্দে জনজীবনকে ফিরিয়ে আনা যায়।

এই চিহ্নিতকরণের জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পরীক্ষা, পরীক্ষা আর পরীক্ষা করে যাওয়া। কিন্তু সেই সময় আমরা অতিরিক্ত চীন নির্ভরশীল ছিলাম। আর সেইসময় চীনের পাঠানো নিম্নমানের কিট আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিতে জল ঢেলে দেয়।

করোনার থাবা যেখানে ইউরোপ, আমেরিকার মতো প্রথম সারির দেশগুলোর উন্নতমানের চিকিৎসা পরিকাঠামোগুলো পর্যন্ত অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে, সেখানে ভারতের মতো জনবহুল ও বিশালায়তন দেশের ক্ষেত্রে আশঙ্কিত হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক কিছু কি ?

যদিও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, কিছু এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ের সংক্রমণ হলেও গোষ্ঠী সংক্রমণ এখনও শুরু হয়নি। সেরকম পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিধিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে।


আপনি বলবেন এর থেকে তো টিবি তে বেশি লোক মরে, করোনা নিয়ে এত অহেতুক বাড়াবাড়ির কি আদেও কোনো মানে হয় ?

হয় কত্তা হয় !

আচ্ছা দেখুন ব্যাপারটা অনেকটা এরকম, ধরুন আপনার কাছে দু’খানা ব্যাগ আছে। প্রথম ব্যাগে,যাতে কিছু লাল বল আছে, কিছু নীল বল আছে, আর কিছু কালো বল আছে — আপনি এই ব্যাগে হাত ঢোকালে কোন রঙের বল পাবেন, সেটা না জানা থাকলেও তিনটের মধ্যে যে কোনও একটা রঙের বল পাবেন সেটা নিশ্চিত, কিন্তু দ্বিতীয় ব্যাগটাতে হাত ঢোকালে, বল পাবেন না কেউটে সাপ পাবেন, সেটাই জানেন না !!

আমাদের এখনকার অবস্থা অনেকটা দ্বিতীয় ব্যাগটার মতন। এখনো পর্যন্ত করোনা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছেও তেমন স্পষ্ট ধারণা নেই, কিন্তু সেই ইস্কুল জীবন থেকে যেটা আছে সেটা হল ভাইরাস সংক্রমিত কীভাবে হয় তার একটা ধারণা। তাই এইসময় সেই ধারণার উপর ভর করেই আমাদের সাবধান থাকাটাই অত্যন্ত জরুরি।


২০১৯-এর ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান প্রদেশে সর্বপ্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কিন্তু চীন নিজেদের বাণিজ্য স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে হু এর সহায়তায় ব্যাপারটাকে চেপে রাখে এবং নিজেদের সাথে সমগ্র বিশ্বকেও বিপদে ফেলে দেয়।

এই ভাইরাসের সংক্রমণ সব বয়েসের মানুষের মধ্যে হলেও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং যারা বয়স্ক, বা যাদের টাইপ ২ ডায়বেটিস, হার্টের সমস্যা, অ্যাজমা, ইত্যাদি অন্যান্য নন কমিউনিকেবল ডিজিজ যাদের আছে তাদের এই রোগে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের থেকে বেশি।


আরও পড়ুন অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ডেকে আনছে অশনি সংকেত


এবার আসি ভয়ের কথায় , দেখুন, কোভিড ১৯ নিয়ে আপনার বা রাম, শ্যাম, যদু, মধুর ভয় হয় কিনা জানিনা, তবে আমার হয় ! আরও ভালোভাবে বলতে গেলে আমার মতো যারা ফি দিন বাসে, ট্রেনে চেপে ১০- ৫ টা থুড়ি ৭ টার জীবন সংগ্রামে ব্রতী হয়েছিলেন, তাদের প্রত্যেকেরই ভয়টা কিঞ্চিৎ বেশিই হয় !


প্রথমদিকে ইতালি এবং অন্যান্য দেশের করোনা সংক্রান্ত যে সমস্ত তথ্য এসেছে তার থেকে জানা যাচ্ছে, যাঁরা করোনায় ওই দুই দেশে মারা গিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশেরই সম্ভবত আগে থেকেই ডায়াবিটিস, কিডনির সমস্যা বা হৃদযন্ত্রে গোলযোগ ছিল। বিশেষজ্ঞরা এখনও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছননি, তবে আগে থেকেই শরীরে বাসা বেঁধে-থাকা কোনও রোগ করোনায় মৃত্যুর নেপথ্যে একটা কারণ হতে পারে, এটা কেউই আপাতত অস্বীকার করছেন না।

আমাদের দেশ হল নন কমিউনিকেবল ডিজিজের আঁতুরঘর। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর) এর রিপোর্ট, “India: Health of the Nation’s States বলছে, যেখানে ১৯৯০ সালে নন কমিউনিকেবল ডিজিজে মৃত্যুর হার ছিল ৩৭.৯% সেখানে তাই ২০১৬ তে এসে দাঁড়ায় ৬১.৮% । যদিও এরজন্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে নিত্য জীবনযাপনের বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য।

ভারতে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়ালো
চিত্র উৎস : India: Health of the Nation’s States

ভারতে প্রতিটা ঘরে ঘরে আর কিছু পান বা না পান একজন ডায়বেটিক রুগী ঠিক পেয়ে যাবেন !

ভারতে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়ালো
চিত্র উৎস : The Hindu

২০১৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল ডায়বেটিস ফাউন্ডেশনের “ডায়বেটিস অ্যাটলাস” বলে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, সেই রিপোর্টে বলা হয়, পুরো বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন হলেন ভারতীয়।

এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতি দশ হাজার মানুষ পিছু হাসপাতালে বেডের সংখ্যাটা মাত্র সাত যা অন্য দেশের তুলনায় অনেকটাই কম।

ভারতে করোনা
Photo by Sharon McCutcheon on Unsplash

আশাকরি বুঝতে পারছেন ইতালি, স্পেন, ইংল্যান্ড বা আমেরিকার মতন পরিস্থিতি হলে ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল কী হবে ?


তবে এই সবকিছুর থেকে সবচেয়ে বেশি যেই জিনিসটিকে নিয়ে ভয় হচ্ছে, সেটি হল “গুজব” নামক ভাইরাস, যা ইন্টারনেটের বদৌলতে অন্য যেকোনো ভাইরাসের চেয়ে অনেক দ্রুত ছড়ায় এবং মানুষকে আরও কঠিন বিপদে ফেলে দেয় !


কি ভয় লাগছে ?

তা লাগুক, ভয় না পেলে ভারতীয়রা বুঝতে পারবেন না রাস্তায় চা খেতে বা আড্ডা মারতে বেরিয়ে, থুতনির নীচে মাস্ক ঝুলিয়ে ঘুরে বেরিয়ে দেশের জন্য তারা কি বিপদটাই না ডেকে আনছেন ! ভয় না পেলে ভারতীয়রা কী করে বুঝবেন মন্দির, মসজিদ, মূর্তি নিয়ে চুলোচুলি করার থেকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিকাঠামো গড়ে তোলা কতটা জরুরি, ভয় না পেলে ভারতীয়রা কী করে বুঝবেন দেশের প্রতিরক্ষা খাতে খরচের মতোই দেশের গবেষণা খাতেও খরচ করাটা কতটা জরুরি !

সর্বোপরি, দেশে আমার আপনার মতো জনগণেরও বোঝা উচিত পরেরবার ধর্মের নামে ধান্দাবাজির উদ্দেশ্যে ভোট দিতে লাইনে দাঁড়াবো নাকি আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর দাবীতে লাইনে দাঁড়াবো !!

তবে এত কিছুর মধ্যেও অন্ধকার ঘরের প্রদীপের অগ্নিশিখার মতো কিছু আশার আলো নিশ্চয়ই আছে। এইমুহুর্তে করোনার সম্ভাব্য প্রতিষেধক খুঁজে বার করতে সমগ্র বিশ্বের বৈজ্ঞানিকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, আমাদের দেশের বৈজ্ঞানিকরাও পিছিয়ে নেই, তাঁরাও কোভ্যাক্সিনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আশাকরা যায় আগামী বছরের মাঝামাঝি সময় একটা না একটা উপায় বেরিয়ে আসবে।


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন