ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

গতবছর সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে, নেটিজেনদের যে বুড়ো বুড়ি সাজার হিড়িক জেগেছিল, তাতে বিশ্বাসই হবে না, যে ভারতীয় সমাজে প্রবীণরা আসলেই “৮০ তে আসিও না” ছবির সদানন্দ ও তাঁর স্ত্রীর মতই উপেক্ষিত।


৮০ তে আসিও না
ইলাস্ট্রেশন : অনিকেত ভাদুড়ী

এই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে যদি ১৯৬৭ সালের বাংলা ছায়াছবি “৮০ তে আসিও না”-র কথা না উল্লেখ করি তাহলে এই লেখাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

“৮০ তে আসিও না” – র মতন তুখোড় কমেডির আড়ালে সামাজিক সমস্যার কথাগুলি রুপোলি পর্দায়, ওইরকম নিপুণতার সাথে ফুটিয়ে তুলে চলচ্চিত্র নির্মাণ বহুদিন আর হয় না।

ওই সময়ের ছবিগুলি দেখলে বুঝতে পারবেন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, রবি ঘোষ, প্রমুখ অভিনেতাদের, আজকের সব কমেডি অভিনেতাদের মত পেটে কাতুকুতু দিয়ে হাসাতে হত না !! বা হাসাতে গিয়ে সস্তা যৌন্য উসকানিমূলক মনোলোগের আশ্রয় নিতে হত না !!

যাইহোক, আসল কথায় আসি, “৮০ তে আসিও না” ছবিটিতে দেখা যায় বার্ধক্য জনিত সমস্যায় ভুগতে থাকা সদানন্দ(ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়) আর তাঁর স্ত্রী প্রতিনিয়ত নিজেদের তিন ছেলে ও তাদের বউএর কাছ থেকে দুর্ব্যবহার ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন। আর এই যন্ত্রণার থেকে নিস্তার পেতে দিনরাত আকাশকুসুম ভেবে চলেছেন।

এরকমই একদিন পূর্ণিমার রাতে বাড়ির উঠোনে, বসে থাকতে থাকতে সদানন্দ(ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়) ঘুমিয়ে পড়েছিলেন আর সেই ঘুমেই স্বপ্নের মধ্যেই তিনি দেখেন হাওয়া বদল করতে ঝান্টিপাহাড়ী তে গিয়ে এক বুড়ো ঘোড়ার পিঠে চেপে আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে করতে এমন এক পুকুরে গিয়ে পড়লেন, যেখান থেকে ওঠার পর উনি জোয়ান হয়ে গেলেন।

সেই কথা যখন ধীরে ধীরে লোকের মুখে মুখে প্রচার হতে শুরু হল তখন ঐ পুকুর কে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে এক অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম তৈরি হল, যেখানে সব দলে দলে জোয়ান হতে ওই গ্রামে আসছে। বুড়ো বুড়িদের পুকুরে ডুব দেওয়ানোর জন্য এক একজন, এক একটা স্টার্ট আপ কোম্পানি খুলে বসল, ঠকবাজদের মেলা বসল, শেষে প্রশাসন থেকে এসে পুকুরটিকে কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে ফেলা হল। এরপরের গল্পটা জানার ইচ্ছা থাকলে, “৮০ তে আসিও না” – র মতন এই অসাধারণ ছবিটা একবার দেখেই ফেলুন না হয় !


আমরা সকলেই কমবেশি কোনো না কোনো সময় অবচেতন মনে “৮০ তে আসিও না” ছবির ভানু বন্দোপাধ্যায়ের মতন এই জাতীয় ইচ্ছাপ্রকাশ করেছি, কখনো ছেলেবেলায় তাড়াতাড়ি বড় হতে চেয়ে, আবার কখনো বড় বা বুড়ো বয়সে ফেলে আসা ছেলেবেলার ওই দিনগুলিতে ফিরে যেতে চেয়ে।

মানুষের মনের এই দিকটা নিয়ে আমাদের প্রিয় দাড়ি বুড়োও কিঞ্চিৎ লেখালেখিও করে গিয়েছেন। এরকমই তাঁর “ইচ্ছাপূরণ” ছোটগল্পে তিনি লিখছেন –

“….সুশীল বিছানায় পড়িয়া কাঁদিতে কাঁদিতে সমস্তদিন ধরিয়া কেবল মনে করিতে লাগিল যে, ‘আহা, যদি কালই আমার বাবার মতাে বয়স হয়, আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি, আমাকে কেউ বন্ধ করে রাখতে পারে না।’

তাহার বাপ সুবলবাবু বাহিরে একলা বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন যে, ‘আমার বাপ মা আমাকে বড়াে বেশি আদর দিতেন বলেই তাে আমার ভালােরকম পড়াশুনাে কিছু হল না। আহা, আবার যদি সেই ছেলেবেলা ফিরে পাই তা হলে আর কিছুতেই সময় নষ্ট না করে কেবল পড়াশুনাে করে নিই।’

ইচ্ছাঠাকরুন সেই সময় ঘরের বাহির দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি বাপের ও ছেলের মনের ইচ্ছা জানিতে পারিয়া ভাবিলেন, আচ্ছা, ভালাে, কিছুদিন ইহাদের ইচ্ছা পূর্ণ করিয়াই দেখা যাক।

এই ভাবিয়া বাপকে গিয়া বলিলেন, “তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হইবে। কাল হইতে তুমি তােমার ছেলের বয়স পাইবে।” ছেলেকে গিয়া বলিলেন, “কাল হইতে তুমি তােমায় বাপের বয়সী হইবে।” শুনিয়া দুইজনে ভারি খুশি হইয়া উঠিলেন।

বৃদ্ধ সুবলচন্দ্র রাত্রে ভালাে ঘুমাইতে পারিতেন না, ভোরের দিকটায় ঘুমাইতেন। কিন্তু আজ তাঁহার কী হইল, হঠাৎ খুব ভােরে উঠিয়া একেবারে লাফ দিয়া বিছানা হইতে নামিয়া পড়িলেন। দেখিলেন, খুব ছােটো হইয়া গেছেন; পড়া দাঁত সবগুলি উঠিয়াছে; মুখের গোঁফদাড়ি সমস্ত কোথায় গেছে, তাহার আর চিহ্ন নাই। রাত্রে যে ধুতি এবং জামা পরিয়া শুইয়াছিলেন, সকালবেলায় তাহা এত ঢিলা হইয়া গেছে যে, হাতের দুই আস্তিন প্রায় মাটি পর্যন্ত ঝুলিয়া পড়িয়াছে, জামার গলা বুক পর্যন্ত নাবিয়াছে, ধুতির কোঁচাটা এতই লুটাইতেছে যে, পা ফেলিয়া চলাই দায়।

আমাদের সুশীলচন্দ্র অন্যদিন ভােরে উঠিয়া চারি দিকে দৌরাত্ম্য করিয়া বেড়ান, কিন্তু আজ তাহার ঘুম আর ভাঙে না; যখন তাহার বাপ সুবলচন্দ্রের চেঁচামেচিতে সে জাগিয়া উঠিল, তখন দেখিল, কাপড়চোপড়গুলাে গায়ে এমনি আঁটিয়া গেছে যে, ছিঁড়িয়া ফাটিয়া কুটিকুটি হইবার জো হইয়াছে; শরীরটা সমস্ত বাড়িয়া উঠিয়াছে; কাঁচা-পাকা গোঁফে-দাড়িতে অর্ধেকটা মুখ দেখাই যায় না; মাথায় একমাথা চুল ছিল, হাত দিয়া দেখে, সামনে চুল নাই-পরিষ্কার টাক তক্ তক্ করিতেছে।……”

কিন্তু নিজের এই পরিবর্তন কল্পনা করা যতটা সহজ, আসলে একে ওপরের ওই বয়সে গিয়ে পড়লে তার তাল সামলানো কিন্তু যথেষ্টই কঠিন ব্যাপার। আর তাই ইচ্ছাপূরণ ছোটগল্পের সুশীল আর সুবল আবার তাদের পুরোনো অবস্থানে ফেরত যেতে চাইল –

“….তখন সুবল একান্তমনে প্রার্থনা করিতে লাগিল যে, “আহা, যদি আমি আমার ছেলে সুশীলের মতাে বড়াে হই এবং স্বাধীন হই, তাহা হইলে বাঁচিয়া যাই।”

সুশীলও প্রতিদিন জোড়হাত করিয়া বলে, “হে দেবতা, বাপের মতাে আমাকে ছােটো করিয়া দাও, মনের সুখে খেলা করিয়া বেড়াই। বাবা যেরকম দুষ্টামি আরম্ভ করিয়াছেন, উঁহাকে আর আমি সামলাইতে পারি না, সর্বদা ভাবিয়া অস্থির হইলাম।”

তখন ইচ্ছাঠাকরুন আসিয়া বলিলেন, “কেমন, তােমাদের শখ মিটিয়াছে?”

তাঁহারা দুইজনেই গড় হইয়া প্রণাম করিয়া কহিলেন, “দোহাই ঠাকরুন, মিটিয়াছে। এখন আমরা যে যাহা ছিলাম আমাদিগকে তাহাই করিয়া দাও।”

ইচ্ছাঠাকরুন বলিলেন, “আচ্ছা, কাল সকালে উঠিয়া তাহাই হইবে।”……..”


অতএব এরথেকে বোঝা যায় আমাদের ইচ্ছা হল ক্ষণস্থায়ী, আর আমাদের এই ক্ষণস্থায়ী ইচ্ছা কে পূরণ করতে গিয়ে আজ আমরা হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে, মাঝেমধ্যে দল বেঁধে কৃত্রিম উপায় বুড়ো হওয়ার প্রতিযোগিতায় লাইন লাগিয়েদি।

আপনারা নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন গতবছর সোশ্যাল মিডিয়ার অলিগলিতে আলোচনার একটাই বিষয় ঘোরাফেরা করছিল। আর সেটা হল ফেসঅ্যাপ।

গতবছর এই ফেসঅ্যাপের সাহায্যে লোকজন নিজের যাবতীয় ব্যাক্তিগত তথ্য উজাড় করে দিয়ে বুড়ো হওয়ার ছবি পেতে পাগল হয়ে গিয়েছিল।

ফেসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের মায়াজালে আটকা পড়তে দলে দলে ওই ট্রেন্ডি সার্কাসে যোগ দিয়েছিল।

অর্থনীতি বিষয় যাঁদের আগ্রহ আছে তাঁরা হয় তো শুনে থাকবেন একটা কথা – ‘there ain’t no such thing as a free lunch’, অনলাইন মার্কেটিং কিভাবে হয় আশাকরি আপনাদের তা কিছুটা হলেও জানা আছে, আজকের যুগে তথ্যই হল নতুন জ্বালানি। ভবিষ্যতে এই তথ্য নিয়ে দেশে দেশে, মানুষে মানুষে যুদ্ধ বাঁধবে।


এবার আসি একটু অন্য প্রসঙ্গে, দেখুন বার্ধক্যের সাথে সাথে কিন্তু সমাজ দ্বারা সৃষ্ট অনেক সমস্যাও আসে। সেই সমস্যা মূলত আর্থ সামাজিক সমস্যা। সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জের পপুলেশন ফান্ড (ইউএনএফপিএ)-এর ‘ইন্ডিয়া এজিং রিপোর্ট, ২০১৭’ অনুযায়ী, আজ থেকে ৩২ বছর পর, ভারতে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৩১ কোটি ৬৮ লক্ষে। ব্যাপারটির গুরুত্ব বোঝানোর জন্য নিম্নে ‘ইন্ডিয়া এজিং রিপোর্ট, ২০১৭’ – র কয়েকটি গ্রাফ যোগ করলাম-

চিত্র ১

চিত্র ২

চিত্র ৩

চিত্র ৪

চিত্র ৫


সমাজবিজ্ঞানের অন্তর্গত মার্ক্সিস্ট স্কুলের সমাজবিজ্ঞানীদের মতে মুনাফা-ভিত্তিক সমাজ এই প্রবীণ নাগরিকদের সমাজের বোঝা মনে করে একঘরে করে দেবে যা ধীরে ধীরে সমাজকে বৈষম্যের দিকে ঠেলে দেবে।

এর ফলস্বরূপ সমাজে অপরাধ ও অন্যান্য অসামাজিক কাজকর্মের প্রবণতা বাড়তে থাকবে। তাই সমাজবিজ্ঞানের আরেকটি স্কুল অফ থট, ফাংশনালিস্ট স্কুল, এই স্কুলের অন্যতম সমাজবিজ্ঞানী ট্যালকট পারসন, বলছেন, নাগরিকদের বয়সের এই বৃদ্ধির সাথে সাথে সমাজের তাদের জন্য সর্বদা একটি বিকল্প ভূমিকা নির্ধারণ করা উচিত।


এই সমস্যার কথা উল্লেখ করে এইবছরে ভারতীয় অর্থ মন্ত্রকের তরফ থেকে প্রকাশিত ইকোনমিক সার্ভে ২০১৮-১৯ এ প্রবীণ নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা আর সেই সাথে পেনশন তহবিলের উপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে অন্যান্য দেশের মতন ভারতেও অবসরের বয়সসীমা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।


আরো পড়ুন – মানসিক অবসাদ : মনের অসুখ, দুঃখ বিলাস নয়!


একটু চোখ কান খোলা রাখলেই দেখতে পারবেন আজ যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বুড়ো বুড়ি সেজে সোশ্যাল মিডিয়াতে লাইক আর কমেন্টের বন্যায় নিজেদের ভাসিয়ে দিচ্ছেন। কাল তারাই হয়তো বাস্তব জীবনে নিজেদের বৃদ্ধ বাবা মা’র প্রতি তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সাথে ব্যবহার করছেন, মারধর করছেন, তাঁদের জোয়ান বয়সে তিল তিল করে জমানো স্বল্প সঞ্চয়ের আত্মসাৎ করছেন আর নয়তো সেই বৃদ্ধ বাবা-মা কে সংসারের বোঝা মনে করে বিভিন্ন রেল স্টেশনে, হাসপাতালে আর খুব কপাল ভালো হলে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে ছেড়ে আসছেন।

এমনি কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছিল ২০১৬ সালের Agewell Foundation এর একটি রিপোর্টে –

৮০ তে আসিও না
Source : Agewell Foundation Report, 2016

বার্ধক্যের এই করুণ দশার কথা মাথায় রেখেই নচিকেতা চক্রবর্তীর প্রতিবাদী কলম থেকে বেরিয়েছিল –

“ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার

মস্ত ফ্লাটে যায় না দেখা এপার ওপার

নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী

সবচে কমদামী ছিলাম একমাত্র আমি

ছেলের আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম

আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।।..”

প্রকৃতির নিয়মে বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের মধ্যে পরিপক্কতা ও দায়িত্ববোধও আসে।

সেই দায়িত্ববোধকে আত্মসুখ আর আমিত্বের আড়ালে কোনো এক আস্তাকুঁড়ে ফেলে রেখে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে চুল দাড়ি পাকিয়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের ওই মেকি লাইক আর কমেন্টের ঝড় তোলার মধ্যে কোনো “কুলনেস” বা “স্মার্টনেস” বিচ্ছুরিত হয়না।

এতগুলো বছর যাদের পাশে পেয়ে আপনি আজকের “আপনি” হয়ে উঠেছেন তাদের এই জীবনযুদ্ধের অন্তিম যাত্রাপথে আর কিছু না পারুন অন্তত লাঠি হয়ে উঠুন। তাদের অন্ধকারে গহ্বরে ঠেলে না দিয়ে আলোর বর্ণচ্ছটা দেখতে সাহায্য করুন।

চেষ্টা করুন যাতে সেই বৃদ্ধ মানুষগুলোকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে না হয়, ৮০ তে আসিও না !

শেষটা আমার অত্যন্ত প্রিয় সদ্যপ্রয়াত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা “শেষ প্রার্থনা” দিয়ে আমার এই লেখার ইতি টানলাম-

“জীবন যখন রৌদ্র-ঝলোমল,

উচ্চকিত হাসির জের টেনে,

অনেক ভালোবাসার কথা জেনে,

সারাটা দিন দুরন্ত উচ্ছ্বল

নেশার ঘোরে কাটল। সব আশা

রাত্রি এলেই আবার কেড়ে নিও,

অন্ধকারে দু-চোখ ভরে দিও

আর কিছু নয়, আলোর ভালোবাসা।”


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন