ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

সাধারণ জ্বর, সর্দি কাশি, পেট ব্যাথা হলেই যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ভারতের মতো তৃতীয় শ্রেণীর দেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের অশনি সংকেত ডেকে আনছে। প্রকৃত পরিস্থিতি আরও অনেক ভয়ঙ্কর, এবং সে কথা আর কেউ নয় খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) তাদের বিভিন্ন রিপোর্টে বলছে।

সেন্টার ফর ডিজিজ ডায়নামিক্স ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিসি (সিডিডিইপি) –র সমীক্ষায় উঠে এল ভয়াল এক তথ্য। তাদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর শুধুমাত্র ভারতেই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণে মারা যায় ৫৮ হাজার শিশু।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী কী ? তা খায় না মাথায় দেয় ? সে বিষয় আলোচনা করার আগে আপনাদেরকে আমার একটা ছোট্ট ঘটনার কথা বলি –

সেদিন আমার বাড়িতে আমার পাশের ফ্ল্যাটের এক সমবয়সি বাঙালি প্রতিবেশী এসেছিল আড্ডা মারতে।

আমার একটু জ্বর,সর্দি কাশি হয়েছে দেখে দুম করে বলে বসে, “আরে ওষুধ খাসনি? দাঁড়া তোকে একটা অ্যান্টিবায়োটিকের নাম বলছি কিনে আগামী সাতদিন খেয়েনে একদম চাঙ্গা হয়ে যাবি।”

“তা কবে পাশ করলি?”, আমি কিছুটা ব্যঙ্গাত্মকভাবেই জিজ্ঞেস করলাম।

“কি পাশের কথা বলছিস বলত?”, ও হতভম্ব হয়ে আমায় জিজ্ঞেস করল।

“কেন এম বি বি এসএম ডি বা এফ আর সি এস? কিন্তু যেখান থেকেই পাশ করে থাকিস না কেন, তাদের অন্তত এই সাধারণ জ্ঞান টুকু দেওয়া উচিত ছিল। জ্বর, সর্দি, কাশি ভাইরাস জনিত রোগ, সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কোনো কাজ তো হবেইনা,উপরন্তু শরীরে ভাল ব্যাকটেরিয়াগুলিকেও মেরে ফেলে।

এরফলে পরবর্তী কালে কোনো ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ হলে সহজলভ্য অ্যান্টিবায়োটিক গুলি আর কাজ করবে না।”


এই ভুলটাই আমরা করে থাকি।

সামান্য জ্বর হল আর আপনি দৌড় দিয়ে ফার্মেসীতে গেলেন আর ফার্মেসীওয়ালার দেওয়া দুই প্রজাতির চারটে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে ফিরলেন ঠিকই, কিন্তু তার সাথে আরেকটা জিনিসও ফাউ নিয়ে ফিরলেন তা হল বিষ, যা ক্রমাগত খেয়ে এক-পা, দু-পা করে এগিয়ে চলেছেন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।

আপনি নির্বিষ জ্বরে যে নানান রঙিন মোড়কে মোড়া অ্যান্টিবায়োটিক গুলি অপচয় করেছেন, প্রাণঘাতী কোন ইনফেকশনে আক্রান্ত হলে বুঝতে পারবেন তার অভাব। শরীরের সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা যখন ধ্বংস হয়ে যাবে, তখন সবচেয়ে ছোট শত্রু, সবচেয়ে ছোট রোগটাই খুব সহজেই আপনাকে ঘায়েল করে ফেলবে।

অনেকটা এইরকম ভাবে –

এই অযৌক্তিক এবং লাগামহীন ব্যবহারের ফলে আপনার অগোচরেই শরীরে তৈরি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু। এই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু ব্যক্তির জন্য প্রাণঘাতী হওয়া ছাড়াও সমাজে ব্যাপক প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে আগামীদিনে ক্যান্সার বা এইডস জনিত রোগের থেকেও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জনিত কারণে মানুষের মৃত্যু অনেক বেশি হবে।

বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রচুর গবেষণা, জ্ঞানের পরিসর এবং অনেক বছরের কাজের ফলে একটি ওষুধ তৈরি হয়। কিন্তু এই একটি ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে অনায়সে যদি ব্যবহারীকারীরা অসাবধানী হন এবং ডাক্তার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ না ব্যবহার করেন।


বিংশ শতাব্দীর শুরুর সময়ে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আবিষ্কারের সাথে সাথে বেশ জনপ্রিয়তা পায়, তখন সবার ধারণা ছিল যে অ্যান্টিবায়োটিক হল সর্বব্যাধির ঔষধ, বিশেষ করে ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগের প্রতিরোধক হিসেবে সব সময় কাজ করবে। কিন্তু ঘটনা হল, সেই সময়ে অনেক লোকের জীবন বাঁচলেও বর্তমানে বাস্তবিক চিত্রটা অন্যরকম, কারণ অধিকাংশ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়াই আমাদের প্রচলিত সব ধরণের ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, ফলে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে এইসব ডানপিটে ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর নির্মূল করা আর সম্ভব নয়।

এইসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যাকে ‘superbugs’ বলে তা একদিনে গড়ে উঠেনি, তিল তিল করে দিনের পর দিন ধরে গড়ে উঠেছে, যার দায় অনেকাংশেই আমাদের মত ব্যবহারকারীদের ওপরেই বর্তায়। একটু ভাল করে খেয়াল করলে দেখা যাবে এই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়েছে নিম্নলিখিত কারণগুলির জন্য –

  • মুড়ি মুড়কির মত, মানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়া।
  • অপরিচ্ছন্নতার জন্য।
  • বিভিন্ন হাসপাতালের পরিষ্কার ও পরিচন্নতায় গাফিলতির জন্য।
  • বিভিন্ন কৃষিক্ষেত্রে অবৈজ্ঞানিক ভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার।
  • গৃহপালিত পশুপাখির চিকিৎসায় ও তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে অপরিমিত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার।
  • যত্রতত্র যেমন খুশি তেমনভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ক্রীম বা বড়ির মোড়ক ফেলে দেওয়া।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স
চিত্র সূত্র : WHO

এই ডাক্তারের ওপর ডাক্তারি ফলাতে গিয়ে নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনছি, আর তাই এখন নিউমোনিয়া,টিবির মতো রোগ গুলি সারছে তো নাই উল্টে রোগীকে আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বই এই অভিশাপের গ্রাসে পড়েছে, কিন্তু সবচাইতে যেটা বেশি চিন্তার তা হল এই রিপোর্টেই ভারতকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের এপিসেন্টার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী,  বিভিন্ন রাজ্যের হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট) ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে শুধু ‘ই কোলাই’ প্রায় ৩০%। মূত্রনালির অন্যান্য সংক্রমণ, ভেন্টিলেটর অ্যাসোসিয়েটেড নিউমোনিয়া এবং রক্ত বা স্যালাইনের চ্যানেল থেকে ছড়ানো সংক্রমণও কম কিছু নয়।

ইতিমধ্যেই যক্ষ্মার জন্য নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের খোঁজে হন্যে এখন চিকিৎসকরা। আগে একটা সময় যক্ষ্মার জন্য বাজারে পাঁচ-ছ’টি ওষুধ মিলত। এ সবের যথেচ্ছ ব্যবহার, বার বার কোর্স শেষ না করা ইত্যাদি কারণে আজকাল অনেক রোগীর শরীরেই পুরনো অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না।

এই প্রবণতা কে থামাতে গেলে কিছু গঠন মূলক ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে যেমন –

  • কঠোর আইনের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ দেওয়া কে বন্ধ করতে হবে।
  • সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অ্যান্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহের মত নিজ নিজ দেশেও এইরকম সচেতনতা অভিযান চালানো।
  • চিকিৎসা ক্ষেত্রে সঠিক নিয়মানুবর্তিতা পালন হচ্ছে কিনা তা গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ চালাতে হবে।
  • নিজের এবং নিজের চারপাশের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।
  • মাঝপথে ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দিয়ে নিজে ডাক্তারি না ফলিয়ে, বরং প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত ডাক্তারের পরার্মশ অনুযায়ী কোর্স কমপ্লিট না হওয়া অবদি ওষুধ খেয়ে যান।
  • কৃষিক্ষেত্র এবং গৃহপালিত পশুপাখির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে অনাবশ্যক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
  • ওষুধের ব্যবহার হয়ে গেলে যত্রতত্র তার খাপ বা মোড় ক ফেলে দেওয়ার থেকে নিজেদের বিরত রাখা।

এখন আধুনিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে খুব সহজেই জানতে পারা যায় কেউ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট কিনা।

সুতরাং, এরপর থেকে কখনো ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দয়া করে ওষুধ কিনে এবং তা খেয়ে নিজেকে ও নিজের চারপাশের বৃহত্তর সমাজকে এই বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার থেকে বিরত থাকুন।


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন