ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

বাংলা ভাষা ও তার সম্পদের প্রাচুর্য সম্পর্কে উপলব্ধি করে মধু কবি লিখেছিলেন, “হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন।”

সময়ের তালে তাল রেখে, এরপরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ২৮ কোটিরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা হল বাংলা,  বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কথিত ভাষা হল বাংলা ভাষা আর পৃথিবীর মধ্যে বাংলা ভাষা হল ষষ্ঠ কথিত ভাষা।

বাংলা ভাষা
ইলাস্ট্রেশন : অনিকেত ভাদুড়ী

এই বাংলা ভাষা কে বাঁচিয়ে রাখতেই শহীদ হতে হয়েছিল বেশ কিছু তরুণ কে, আজকে এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আসুন একটু সেই ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই।


১৯৪৭ এ স্বাধীনতা ও মর্মান্তিক দেশ ভাগের স্মৃতি ছেড়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে যখন দুটো দেশ এগোতে চেষ্টা করছে ঠিক তখনই পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ও একসময়ের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধারক ও বাহক হিসাবে নিজের পরিচয় দেওয়া মহম্মদ আলী জিন্নাহ ওরফে কায়েদে আজম ঢাকায় এসে ঘোষণা করলেন

“উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা।”

মহম্মদ আলী জিন্নাহ

এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ঘোষণার সময় তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন যে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬% জনগনই বাংলা ভাষাভাষীর মানুষজন। যাঁরা বখতিয়ার খলজির বাংলা আক্রমণের পরে ব্যাপক হারে ধর্মান্তরিত হলেও তাঁদের এতদিনের লালিত ও স্নেহতুল্য মায়ের ভাষা ও সংস্কৃতির অকাল মৃত্যু ঘটতে দেননি।

পরবর্তীকালে করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেস দলের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর প্রস্তাবে বাংলা ভাষাকেও পরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবি জানান। কিন্তু তা পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দ দের দ্বারা নাকচ হয়ে যায়।

জিন্নাহ এবং পাকিস্তানের অন্য নেতৃবৃন্দর এই ভাষা সংক্রান্ত গোঁড়ামি ও ঔদ্ধত্যই ধীরে ধীরে পরোক্ষভাবে একাত্তরের বীজ বপন করতে সাহায্য করেছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এই অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই পূর্ব বাংলায় বাংলা ভাষা কেন্দ্রিক যে আন্দোলন শুরু হয়, তা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি আস্থার বহিঃপ্রকাশ।

১৯৫২ সালের ২৬শে জানুয়ারি ফের ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন, জিন্নাহর অনুকরণে উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার নতুন ঘোষণা করেন।

পাকিস্তানের এই স্বৈরাচারী মানসিকতার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী তীব্র জনমত গড়ে উঠতে থাকে। এর ফল ইতিহাসের নিয়ম মেনে যা হবার তাই হতে শুরু করল। ছাত্র ও যুব সমাজের প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠল ঢাকার রাজপথ।

২০ শে ফেব্রুয়ারি সরকারি এক ঘোষণায় মাধ্যমে জানানো হয়, ২১ শে ফেব্রুয়ারি থেকে দেশ জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করার কথা। সভা, সমাবেশ, মিছিল এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

এতৎসত্বেও, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের, তাঁদের ভাষার প্রতি আবেগকে দমিয়ে রাখা যায়নি।

২১ শে ফেব্রুয়ারি, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সভা থেকে ১০ জন করে মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

এমন সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিক থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে এগিয়ে চলা মিছিলের উপর পুলিশ কোনো সাবধানবাণী ছাড়াই লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে থাকে।

এই ছাত্র পুলিশ বিক্ষোভ যখন চরম পর্যায় পৌঁছে যায়, তখন পুলিশ কাপুরুষের মত নিরপরাধ কিছু ছাত্রের উপর গুলি বর্ষণ শুরু করে এবং তাতে একে একে লুটিয়ে পড়ে আবুল বরকত, জব্বার, রফিক, সালাম সহ আরও অনেকে।

বাংলা ভাষা
চিত্র সূত্রঃ Wikimedia Commons

ঢাকায় পুলিশের এই কাপুরুষোচিত ছাত্র হত্যালীলার খবর চারিদিকে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। এমন সময় আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখলেন –

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু ঝরা এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।

জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।

সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,
এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।।

সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা,
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে
ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভায়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

পরে সেই সব শহীদদের স্মৃতি অমর করে রাখার জন্য ঢাকায় শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। এই ভাষা আন্দোলন কে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান যাকে আমরা ইউনেস্কো নামে জানি তারা বাংলাদেশের ২১ শে ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবসকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।


আরো পড়ুন – চিনতে না কি সোনার ছেলে ক্ষুদিরাম কে চিনতে ?

যেই বাংলা ভাষা কে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে এতগুলি প্রাণ তাঁদের আত্মত্যাগ দিলেন সেই ভাষাতে কথা বলতে পেরে আমি শুধু গর্বিতই নই, ভাগ্যবানও বটে।

“আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মায়ের ভাষা কে আমার বিনম্র প্রণাম।


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন