ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন

“আমি অন্য কোথাও যাবো না, আমি এই দেশেতেই থাকবো….” সম্প্রতি টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের বানানো “নিজেদের মতে, নিজেদের গান” মিউজিক ভিডিও নেট দুনিয়ায় আলোড়নই শুধু ফেলে দেয়নি তা বাংলা তথা ভারতের মুক্ত চিন্তা পোষণকারী নাগরিকদের হৃদয়ও জিতে নিয়েছে।

নিজেদের মতে, নিজেদের গান
চিত্র সূত্রঃ ইউনাইটেড সিটিজেন

ইউনাইটেড সিটিজেন নামক গোষ্ঠীর ইউটিউব চ্যানেলে মিউজিক ভিডিওটির বিস্তারিত অংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “তাসের দেশ” থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা হয়েছে –

‘তাসের দেশ’ হেঁকে বলছে
‘চলো নিয়ম মতে’
দূরে তাকিয়ো নাকো
ঘাড় বাঁকিয়ো নাকো
চলো সমান পথে
চলো নিয়ম মতে

কাদের তৈরী নিয়ম? কারা বলছে না তাকাতে…
ঘাড় বাঁকাতে নিষেধ করছে কারা?

এই মিউজিক ভিডিওর শুরুতে দেখা যাচ্ছে একজন তরুণ একটি প্ল্যাকার্ড হাতে কোথাও প্রবেশ করছেন, আর সেই প্ল্যাকার্ডে লেখা “শিব ঠাকুরের আপন দেশে, নিয়ম কানুন সর্বনেশে”। ওই প্রবেশ পথের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে একটি বাচ্চা মেয়ে বেলুন বিক্রি করছে।

কোনও দলেই নেই যাঁরা, এই গান তাঁদের। এভাবেই ‘নিজেদের মতে, নিজেদের গান’ বেঁধেছেন শিল্পীরা। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি থেকে উত্তরপ্রদেশের ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের খতিয়ান, গানের প্রত্যেকটি লাইনে রয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরোধীতা। কটাক্ষ করা হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিকে।

অনির্বাণ ভট্টাচার্য্যের কলমে আর টালিগঞ্জের তরুণ তুর্কি অর্থাৎ ঋদ্ধি সেন, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, সুরঙ্গনা বন্দোপাধ্যায় দের শৈল্পিক ছোঁয়ায় তৈরি হয়েছে এই মিউজিক ভিডিও।

এই কর্মযজ্ঞে নতুন প্রজন্মের পাশে থেকে অভিভাবকের মতো কাজ করেছেন কলকাতার পরিচিত বিশিষ্টজনেরা। সেই তালিকায় রয়েছেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, কৌশিক সেন, রেশমী সেন, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, অনুপম রায়, রূপঙ্কর বাগচী, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, চন্দন সেন, রাহুল চট্টোপাধ্যায়, দেবলীনা দত্ত, সুমন মুখোপাধ্যায়ের মতো একাধিক তারকা।

গানটির শৈল্পিক বুনোটে উঠে এসেছে এন আর সি, সি এ এ, অবৈজ্ঞানিক চর্চা, বেকারত্বের মতো ভারতের এইমুহূর্তে সবচেয়ে চর্চিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলি।


আরো পড়ুন – NRC খায় না মাথায় দেয় ?


নিজেদের মতে, নিজেদের গান – এ বার্তাটি বিজেপি বিরোধী হলেও, অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মতে, নাগরিক সমাজের কোনো নির্দিষ্ট দলের বর্ণ গ্রহণ না করে বরং বর্তমান সময়ের আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলা উচিত।

নবান্ন দখলের লড়াইয়ে যখন অগ্নিগর্ভ বাংলা। যেখানে খেলা হবে স্লোগানের আড়ালে রণক্ষেত্র বেধে গিয়েছে।

সেই বহু প্রতীক্ষিত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বোধনের ঠিক দুই দিন আগে হঠাৎই সোশ্যাল মিডিয়া ভাইরাল হয়ে উঠল এই ‘নিজেদের মতে, নিজেদের গান’। 

কলকাতার ট্যাংরা অঞ্চলের বিখ্যাত ‘চাইনিজ কালী মন্দির’, নাখোদা মসজিদের সামনের রাস্তার পাশে হালিম বিক্রী সহ এরকম আরও অনেক ইস্টার এগ রয়েছে মিউজিক ভিডিওতে যা বাংলার সহনশীলতা এবং বহুত্ববাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে তুলে ধরে।

গানটি মঙ্গলবার রাতে ইউটিউব, ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিউয়ারশিপ লক্ষাধিক পার হয়ে গিয়েছে। বাংলা তথা ভারতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের থেকে প্রশংসাও কুড়িয়ে নিয়েছে।

বৈচিত্র্য ও ভালবাসার দেশ ভারতবর্ষ। এমন দেশে হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরে করোনার থেকেও দ্রুত গতিতে মিথ্যা এবং ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে।

ওই ছড়িয়ে পড়া ঘৃণা যখন ভারতের সেই বহুত্ববাদকে খর্ব করে দেশের জনমতের গলা টিপে শ্বাসরোধ করে, তখন সুস্থ শাসনতন্ত্রের দাবিতে প্রতিবাদী কণ্ঠ বলে ওঠে , “আমি গোয়েবলসের আয়নায় ঠিক তোমাকেই দেখে ফেলেছি/এই হাঙরের দাঁত পুরনো, তাতে পোকা লেগে আছে দেখেছি”।

তাই যারা “সব ধরনের অঙ্ক পাকিস্তান দিয়ে গুণ” করতে করতে “বহু দূর বেড়ে গিয়েছ” তাদের আর কোনো কথা শোনা হবে না।

ভিডিওর শেষে দেখা যায় বেলুন বিক্রি করা ওই বাচ্চা মেয়েটি তাঁর মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠে গেয়ে ওঠে, ‘আমি অন্য কোথাও যাব না, আমি ভারতবর্ষে থাকব’। আর ঠিক সেই সময়ই ভিড় থেকে বেরিয়ে এসে একজন ওই বাচ্চা মেয়েটির হাতে তুলে দেয় ‘রক্তকরবী’!

দাড়ি বুড়োর “রক্তকরবী” নাটকে সেই যক্ষপুরীর শেকল ছেড়ে মুক্ত হওয়ার বার্তা আনে নন্দিনী। 

অন্ধকারে মুখ ঢাকা অত্যাচারী ক্রূর রাজার অরাজকতায় এই বাচ্চা মেয়েটাই কি তবে ‘নন্দিনী’?


ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন